এই সময়: বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কাছে এক রিয়েল এস্টেট সংস্থার কর্তা হাতে প্যাকেট নিয়ে হাজির। শমীক জানতে চাইলেন, ‘কী ব্যাপার?’ রিয়েল এস্টেট কর্তা জানালেন, ‘আপনার অফিস থেকে ফোন এসেছে। ফোনে বলেছে, কিছু তো পাঠালেন না, টাকা লাগবে। আমরা তাই দেখা করতে এলাম, মাঝখানে অন্য লোক কেন থাকবে, আমরা সরাসরি দিতে এসেছি।’ বিস্মিত শমীক বলেন, ‘এই গ্রুপের নাম শুনেছি, কিন্তু আপনাকে আমি চিনি না। আপনার সঙ্গে পরিচয় না–থাকলে কী ভাবে টাকা চাইব? পার্টির অন্য কেউ চেয়েছে?’ রিয়েল এস্টেট কর্তার উত্তর, ‘আপনার ফোন থেকে কল এসেছে।’
ওই রিয়েল এস্টেট কর্তার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড শমীক দেখতে চান। শমীকের কথায়, ‘ফোনে দেখলাম আমার ছবি, শমীক ভট্টাচার্য নাম লেখা। আমার নামে সিম তোলা হয়েছে। কী ভাবে করেছে, তা জানি না। ওঁকে (রিয়েল এস্টেট কর্তা) দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিধাননগর সাইবার থানায় রিপোর্ট করালাম। দেখা গেল, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি থেকে ফোন আসছে। সাত দিন পরে সালকিয়া থেকে সেই ব্যক্তিকে ধরা হয়েছে।’
গত ৪ মে রাজ্যে পালবদলের পরে গেরুয়া শিবিরের নাম করে তোলাবাজির বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু খোদ বিজেপির রাজ্য সভাপতির নাম করে তোলা চাওয়ার ঘটনাও যে ঘটেছে, সেটা রবিবার দুপুরে ইএম বাইপাস লাগোয়া একটি হোটেলে এক বণিকসভার অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে আনলেন তিনি নিজেই। ওটা যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সেটাও শমীক জানিয়েছেন। রাজ্যের বড়–মাঝারি নির্মাণসংস্থার কর্তাদের উদ্দেশে এ দিন শমীক বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা সব জায়গায় ঘটছে। পার্টির নামে যদি কোনও তোলাবাজির কথা শুনতে পান, তা হলে আমাকে জানাবেন। আমার অফিসকে জানাবেন। আমরা দলের পক্ষ থেকে যা ব্যবস্থা নেওয়ার, নেব। মুখ্যমন্ত্রীও ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করেছেন।’
শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তোলাবাজি নিয়ে অভিযোগ জানাতে টোল–ফ্রি নাম্বার চালু করেছে। যদিও বিরোধী দল তৃণমূলের দুই শিবিরই একাধিক বার অভিযোগ করেছে যে, জরিমানা আদায়, তোলাবাজি বন্ধ হয়নি। তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার বলেন, ‘শমীক ভট্টাচার্যের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনি (শমীক) সভাপতি পদে বসে নিজের বদনাম কুড়োচ্ছেন।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের জমানার ‘তোলাবাজি সংস্কৃতি’ বিজেপি ক্ষমতায় এসে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ যে করতে পারেনি, সেটা গেরুয়া শিবিরের নেতারা অস্বীকার করছেন না। শমীক বুঝিয়েছেন, তাঁর কাছেও প্রায়ই এমন অভিযোগ আসছে। এ দিন বণিকসভার অনুষ্ঠানে শমীক বলেন, ‘কেউ কেউ গেরুয়া আবির মেখে কারখানায় চলে যাচ্ছে। আজ (রবিবার) সকালে শুনলাম, আমার নাম করে নিউ টাউনে একটি প্রজেক্ট বন্ধ করে রেখেছে। আমি গ্রেপ্তার করার জন্য খবর দিয়েছি। পুলিশ বলেছে, বিকেল ৪টের মধ্যে জানাবে, কী পদক্ষেপ করা হয়েছে।’
রবিবার যে বণিকসভার অনুষ্ঠানে শমীক গিয়েছিলেন, সেটি নির্মাতা সংস্থা, রিয়েল এস্টেট সংস্থার সংগঠন। দেড় দশকের তৃণমূল জমানায় তোলাবাজি, সিন্ডিকেট–রাজের দাপাদাপিতে প্রোমোটার, বিল্ডার, রিয়েল এস্টেট কর্তা, কনট্রাক্টরদের নাজেহাল হওয়ার ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠেছে। তিন মাসের বিজেপি সরকার সেই প্রবণতায় পুরোপুরি লাগাম পরাতে পারেনি, বরং গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধেই একাধিক জায়গায় তোলা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই বণিকসভার উদ্দেশে বঙ্গ–বিজেপির সভাপতির বার্তা, ‘ফুলপ্রুফ সিস্টেম বলে কিছু হয় না। তবে আপনারা নির্ভয়ে ব্যবসা করবেন। কাউন্সিলার কোথাও ঝামেলা করলে টোল ফ্রি নাম্বারে জানাবেন। যারা বিজেপি সেজে পৌঁছে গিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করেছি। কিন্তু প্রতিটি কোণার খবর নেওয়ার মতো পরিকাঠামো দলের থাকে না। আপনারাও যে খবর পাবেন, তা আমাদের জানাবেন।’
এই তোলাবাজি–সংস্কৃতির কারণে কী ভাবে নদিয়ার এক ঠিকাদার ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন কিংবা গুজরাটের বড় ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে রাজি হননি, সেই সব উদাহরণ দিয়েছেন শমীক। গুজরাট কিংবা মহারাষ্ট্রের স্বর্ণশিল্প ও হিরেশিল্প বাংলার কারিগরদের উপর নির্ভরশীল। অথচ সেখানকার উদ্যোগীরা পশ্চিমবঙ্গে ‘থ্রেট কালচারের’ কারণে এতদিন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাননি— এ কথা সুরাটের এক বড় ব্যবসায়ী তাঁকে জানিয়েছেন বলে শমীকের বক্তব্য। শমীক জানান, ভিন রাজ্যের এই উদ্যোগপতিদের পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসার দায়িত্ব বর্তমান রাজ্য সরকারের। নবান্ন আপাতত বহুতল ও রিয়েল এস্টেটের নির্মাণে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তার জন্য নির্মাণ শিল্পে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর হয়ে যাবে বলেও শমীক আশ্বাস দিয়েছেন।