রবীন্দ্র সঙ্গীত তাঁর বেঁচে থাকার রসদ। এক সময়ে সংসারও চলেছে সেই গান শিখিয়ে। পরে কোভিড এসে রুজিরুটি কাড়লেও, গানের নেশা ছাড়তে পারেননি। পেট চালা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিও করতে হয়েছে। কিন্তু হৃদয়ে থেকে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। নিরাপত্তারক্ষীর কাজের মাঝেই গলা খুলে গেয়েছেন ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে...’। সমাজমাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে গানের ভিডিয়ো। সেই ভাইরাল ভিডিয়োর কারণে এ বার নিরাপত্তারক্ষীর চাকরিটাও হারালেন ‘গানওয়ালা’ শোভন চক্রবর্তী!
শোভন এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘দিন পনেরো আগে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিটাও হারালাম। আমার গান গাওয়ার ভিডিয়োটা ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল বলেই এটা ঘটেছে। সেক্টর ফাইভের একটা অফিসে চাকরিটা করতাম। ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পরে আমায় ডেকেছিল, আমার দ্বারা নাকি এই চাকরি হবে না! গান গাইতে গাইতে নাকি এই চাকরি হয় না! তাই আমি যেন শুধু গানই গাই।’
মাত্র আড়াই বছর বয়সে মা পুতুল চক্রবর্তীর কাছে গান শেখা শুরু শোভনের। পরে বড় হয়ে শান্তিনিকেতনের সঙ্গীত ভবনে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশোনার মাঝে কয়েক জনকে গানও শেখাতেন তিনি। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সঙ্গীত ভবনে রবীন্দ্রচর্চার পাট চুকিয়ে কলকাতায় ফিরতে হয় শোভনদের। এক সময়ে কচিকাঁচাদের দিনরাত গান শেখাতেন তিনি। কেউ গান শিখতে আসত, কেউ তবলা শিখতে।
কিন্তু অতিমারির পরে বদলে যায় সেই ছবি। ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকে। একটা সময়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাঁর গান শেখানোর ক্লাস। শোভন বলেন, ‘এক সময়ে গান আর লেখাপড়ায় ডিগ্রি পাওয়ার নেশায় অনেক সুযোগ হাতছাড়া করেছি আমি। কিন্তু এ সব নিয়ে কখনও আক্ষেপ করিনি। গানবাজনা নিয়ে সুখেই ছিলাম। তার সঙ্গে বাংলা মিডিয়ামের ছেলেমেয়েদের আর্টস গ্রুপও পড়াতাম। তার পরে তো একে একে সব গেল! তার পরেই নিরাপত্তারক্ষীর চাকরিটা পাই। পেট চালাতে হবে তো, তাই এটা আর হাতছাড়া করিনি।’
সেই চাকরিটাও চলে যাওয়ায় এখন খানিক বেকায়দায় পড়েছেন চল্লিশ ছুঁইছুঁই শোভন। বেহালার সখের বাজারে বাড়িতে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকেন তিনি। শোভন জানান, এখন দু’-একটা গানের টিউশন জুটেছে ঠিকই। অনলাইনেও কিছু ক্লাস নেন এখন। কিন্তু সংসার চালাতে তা যথেষ্ট নয়। শোভন বলেন, ‘গানের টিউশনের জন্য কেউ কেউ ফোন করছেন। কিন্তু কোনও ফোন আসছে যাদবপুর থেকে, আবার কোনও ফোন আসছে দমদম থেকে। এত দূরে দূরে গিয়ে কী ভাবে গান শেখাব, জানি না। অনেকেই তো অনলাইনে ক্লাস করতে চায় না। সাধারণ মানুষের কাছে আমার শুধু একটাই অনুরোধ, কেউ গান শিখতে চাইলে, আমার কথা বলতে পারেন। আমি কারও অর্থ সাহায্য চাই না। কাজ করেই খেতে চাই।’