• বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদের হাত ধরে মোধেরার মন্দিরে ফের সূর্যোদয়
    এই সময় | ১০ আগস্ট ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাজার বছরের পুরোনো সূর্য মন্দিরের মাথায় একদিন ধ্বজা উড়ত। সে দিন অস্ত গিয়েছে অনেক আগে। সোলাঙ্কি রাজা প্রথম ভীমের আমলে তৈরি, প্রায় হাজার বছরের পুরোনো ওই মন্দিরে প্রথম আক্রমণ চালান গজনির সুলতান মাহমুদ। পরে আলাউদ্দিন খিলজির সে‍নাবাহিনীর হাতে মন্দিরটি ধ্বংস হয়। চিরতরে হারিয়ে যায় প্রধান বিগ্রহ। প্রায় সাতশো বছর আগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ওই মন্দির চত্বরে এখন প্রত্নতত্ত্ববিদদের ব্যস্ততা। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই)–র সংস্কারের কাজ শেষ পর্যায়ে। মন্দির কমপ্লেক্সে সেজে উঠছে সংগ্রহশালা। বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ শুভ মজুমদারের নেতৃত্বে দেশের পশ্চিমতম প্রদেশে ফের এই 'সূর্যোদয়'।

    কাশ্মীরের মার্তণ্ড মন্দির তৈরির প্রায় ৩০০ বছর পরে এবং ওডিশার কোণার্ক মন্দিরের অন্তত ২০০ বছর আগে গঠিত হয় গুজরাটের মোধেরার সূর্য মন্দিরটি। পুষ্পবতী নদীর তীরের এই মন্দির দূর থেকে দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে তার স্থাপত্য। একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তৈরি এই মন্দির পশ্চিম ভারতের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। মারু-গুর্জর রীতির মন্দিরে সূর্যের উপাসনা আর স্থাপত্য একই সূত্রে বাঁধা। গর্ভগৃহ, গূঢ়মণ্ডপ, পৃথক সভামণ্ডপ ও মন্দিরের সামনের বিশাল 'রামকুণ্ড' দিয়ে সাজানো চত্বরটিই সুপরিকল্পিত। কুণ্ডের দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির দু'পাশে ছোট ছোট মন্দির। সভামণ্ডপের সামনে কীর্তিতোরণের অবশিষ্ট স্তম্ভ এখনও জাঁকজমকের ইঙ্গিত দেয়। খিলান নেই, তোরণের উপরের অংশও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু যা টিকে গিয়েছে, সেটাই প্রাচীন স্থপতিদের পরিকল্পনার ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।

    তাঁদের কাজেই এ বার সংস্কারের ছোঁয়া। 'এই সময়'–কে শুভ বলেন, 'সবচেয়ে অদ্ভুত হলো মন্দিরের সামনের রামকুণ্ড। অন্য কোথাও সূর্য মন্দিরের সামনে এমন কুণ্ড পাওয়া যায়নি।' তবে বিস্ময় আরও আছে। মন্দিরে একটি ভূগর্ভস্থ অ্যান্টি–চেম্বার পাওয়া গিয়েছে, যা বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুভর কথায়, 'মনে করা হচ্ছে, ওখানে তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ চলত। হলুদাভ বেলেপাথরে তৈরি মন্দিরের দেওয়ালে চোখে পড়ে সূর্য, আদিত্য, লোকপাল, দেবী, যোদ্ধা ও নৃত্যরত নারীমূর্তি। দেখা মেলে গাধার পিঠে বসা শীতলার মূর্তিও। কোথাও রামায়ণের দৃশ্য, কোথাও বা পুরাণের।'

    তাঁর কথায়, 'ওই কুণ্ড থেকে বহু মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে। সম্ভবত আক্রমণের পরে এ সব ভেঙে ফেলা হয়। শনাক্তকরণ ও সংস্কার হয়ে গিয়েছে, মন্দির–সংলগ্ন সংগ্রহশালায় রাখা হবে সেগুলিকে।' পাশাপাশি দেশের অন্য সূর্য মন্দিরগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও থাকবে সংগ্রহশালায়। সূর্যের নানা ধরনের বিগ্রহের পরিচয় দেওয়া থাকবে। যে সব গুহাচিত্রে সূর্যপুজোর উদাহরণ রয়েছে, সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকবে। ভারতের বাইরে সূর্যপুজোর উল্লেখও থাকবে।

    এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে ১৯৫৭-৫৮ নাগাদ সংস্কারের কাজ শুরু করেছিল এএসআই। বসে যাওয়া সূর্যকুণ্ডের সিঁড়ি খুলে ফের বসানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র মন্দির মেরামত, নৃত্যমণ্ডপের ছাদ থেকে এলোমেলো পাথর সরানো, ভাঙা স্থাপত্যের অংশ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে চলেছে একের পর এক সংরক্ষণ প্রক্রিয়া। বেমানান লোহার বিম সরানো হয়েছিল সভামণ্ডপ থেকে। সেই কাজই পূর্ণতা পেতে চলেছে শুভর হাত ধরে। যে উদ্যোগ শুধু পুরোনো পাথর বাঁচানোর নয়, সময়ের ক্ষয়ে ছড়িয়ে পড়া স্থাপত্য-পরিকল্পনাকে ফের পাঠযোগ্য করে তোলার চেষ্টা।

  • Link to this news (এই সময়)