এই বিগ্রহের জন্য আস্ত একটা যুদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গ-কলিঙ্গ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ওড়িশা সেনার সমস্ত প্রতিরোধ চূর্ণ করে রাজা প্রতাপাদিত্য সেই বিগ্রহ নিয়ে আসেন নিজের রাজধানী যশোরে। বঙ্গ-কলিঙ্গ যুদ্ধ, পুরীর মন্দির উদ্ধার, মোগল-পাঠান যুদ্ধ, অনেক ইতিহাস, বারুদের গন্ধ জড়িয়ে এই মূর্তির সঙ্গে।
শোনা যায় ১০,০০০ অশ্বারোহী, বিশাল নৌবাহিনী আর ১৬টি হাতির অধিপতি বারো ভূঁইয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা প্রতাপাদিত্য কাকা বসন্ত রায়ের আদেশে এই মূর্তি পুরী থেকে নিয়ে এসেছিলেন। সঙ্গে বিগ্রহের নিত্যসেবার জন্য এক অধিকারী সেবায়তকেও নিয়ে আসেন। সেই মূর্তি এখন নবান্নর (Nabanna) হেফাজতে। সঙ্গী রাধারানির একটি অষ্টধাতুর মূর্তিও।
প্রতাপাদিত্যর বংশধর শিবাজি রায় সম্প্রতি দুর্মূল্য এই মূর্তি দু’টি রাজ্য সরকারকে দান করেন। পুরাতত্ত্ব বিভাগের বেহালার সংগ্রহশালায় শায়িত সেই বিস্ময় বিগ্রহ যুগল। কষ্টিপাথরের গোবিন্দমূর্তি ও অষ্টধাতুর রাধারানির বিগ্রহ। ইতিহাস বলছে, মুঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের ঘুম উড়িয়ে দেওয়া যশোরের স্বাধীন রাজা প্রতাপাদিত্য ১৫৯৩ সালে এই মূর্তিটি নিয়ে আসেন। তবে ওড়িশার রাজশক্তি ও প্রজা সাধারণ নিজেদের বিগ্রহ সহজে ছাড়েনি। ফলে ‘জলেশ্বর’-এর মাটিতে বেঁধেছিল এক ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। ওড়িশার সেনাদের প্রতিরোধ চূর্ণ করে প্রতাপাদিত্য সেই বিগ্রহ নিয়ে পৌঁছন নিজের রাজধানী যশোরের ঈশ্বরীপুরে। সেখানে পৌঁছে একই আদলে গড়ে তোলেন অষ্টধাতুর রাই সুন্দরীর মূর্তি। বিগ্রহ যুগলের প্রতিষ্ঠায় তৈরি হয় চার-মন্দিরের অনন্য স্থাপত্য। যার পাশে ছিল ১০০ বিঘার বিশাল দিঘি আর অলঙ্কৃত দোলমঞ্চ।
সময়ের নিয়মে সাম্রাজ্য পতন হয়েছে। রাজা মান সিংহের মুঘল বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখসমরে পরাজয়ের পর বন্দী প্রতাপাদিত্য পথেই প্রাণ হারান। আর রাজপুতানার ‘জহরব্রতে’র মতোই, লাঞ্ছনা এড়াতে যমুনা তীরের প্রাসাদে নিজেদের আগুনে আহুতি দেন রাজমহিষী, পুত্র ও পৌত্ররা।
দেশভাগের পর সেই রাধা-কৃষ্ণমূর্তিও উদ্বাস্তুদের মতো চলে আসে এপারে। বসিরহাটের গোপালপুরে। সেখানেই ১৯৫৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কালীপদ মুখোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের সহযোগিতায় রাধাকৃষ্ণর নতুন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বংশধর লালমোহন রায় ও নেপালচন্দ্র রায়। গোপালপুর থেকে সেই মূর্তি যুগল বাক্সবন্দি হয়ে চলে আসে দক্ষিণ শহরতলির সন্তোষপুরে।
প্রতাপাদিত্যর বংশধর তথা লালমোহনবাবুর ছেলে শিবাজি রায় জানালেন, “ওই মূর্তির নিত্যসেবার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। তাই সন্তোষপুরে বাক্সবন্দি করে নিয়ে আসি। পুরাতত্ত্ব বিভাগের যুগ্ম অধিকর্তা কাজল ভট্টাচার্য খবর পেয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।” ৭৮ বছরের শিবাজিবাবু জানালেন, “এই বিগ্রহের জন্য আস্ত একটা যুদ্ধ হয়েছিল। অনেক অলৌকিক ঘটনা জড়িয়ে এই বিগ্রহের সঙ্গে। সরকারের হাতে দিতে পেরে অনেক স্বস্তি লাগছে।”