‘পশ্চিমবঙ্গ কোনও রাজনৈতিক দলের জমিদারি নয়, আমি ফেরায় এত জ্বালা কেন?’, বামেদের তোপ তসলিমার
প্রতিদিন | ১১ আগস্ট ২০২৬
দু’দশকের নির্বাসন অভিশাপ কাটিয়ে সম্প্রতি বদলের বাংলায় পা রেখেছিলেন তসলিমা নাসরিন। তবে কলকাতা থেকে বিদায় নিলেও লেখিকার বঙ্গসফর এখনও আতশকাচে। কাটাছেঁড়াও চলছে নিরন্তর! বিশেষ করে তসলিমার কলকাতায় আগমন নিয়ে বামসমর্থকদের একাংশ রে-রে করে উঠেছেন। এবার সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খুলেই বামেদের একহাত নিলেন ‘লজ্জা’ লেখিকা।
২০০৭ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে কলকাতা থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল তসলিমা নারসিনকে। সেই ‘লজ্জা’ কাটিয়ে দীর্ঘ উনিশ বছর বাদে আবারও সেই শহর কলকাতাতেই পা রাখেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা। এরপর থেকেই নেটভুবনে বাম শিবিরের একাংশ লেখিকাকে তোপ দাগা শুরু করে। স্বভূম, ওপার বাংলা থেকেও ধেয়ে এসেছে কটাক্ষবাণ। সোমবার সেই প্রেক্ষিতেই দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে নিন্দুক-সমালোচকদের যথাযোগ্য স্থান দর্শিয়েছেন তসলিমা! তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরা নিয়ে বামপন্থীদের এত জ্বালা কেন? বাংলাদেশের বামপন্থী তরুণ নেতা মেঘমল্লার বসুকে নিয়ে আমি ফেসবুকে কত লিখেছি! তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছি, তাঁর ওপর মৌলবাদীদের আক্রমণের প্রতিবাদ করেছি, এমনকী একদিন তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখতে চাই বলেছি। সেই মেঘমল্লারই এখন আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন। প্রাক্তন নকশাল প্রশান্ত রায় সাতাশ বছর ধরে আমার প্রকাশক। শুধু প্রকাশক নন, আপন দাদার মতো, আত্মীয়ের মতো কাছের মানুষ। তিনিও এখন আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। তিনিও বাজে কথা বলছেন। হঠাৎ কী হল এঁদের? আমার বিরুদ্ধে এত বিষ কেন? আমার অপরাধটা কী? উনিশ বছর পর আমি পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছি— এটাই অপরাধ? পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন— এটাই অপরাধ? সেক্যুলার মিশনের কর্ণধার ওসমান মল্লিক আমাকে যে মঞ্চে স্বাগত জানিয়েছেন, সেই মঞ্চে উপস্থিত বক্তাদের কেউ বিজেপির সমর্থক, কেউ সরাসরি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত— এটাই অপরাধ?’
কলকাতা সফরের আবহে তসলিমাকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলেও কটাক্ষ শুনতে হয়। এপ্রসঙ্গে লেখিকা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘সেদিন যাঁরা হাজির ছিলেন, তাঁরা কিন্তু বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে, সেই মঞ্চে ছিলেন না। স্বপন দাশগুপ্ত, তথাগত রায়, মোহিত রায়, শাশ্বতী ঘোষ, বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরার পক্ষে কথা বলেছেন, আমার ফেরার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। সেকারণেই তাঁরা ওই মঞ্চে ছিলেন।’ এরপরই বামেদের বিরুদ্ধে কার্যত খড়্গহস্ত হন লেখিকা! তাঁর কলককাতায় পা রাখা নিয়ে বামেদের অস্বস্তির কারণ ব্যাখ্যা করে তসলিমার মন্তব্য, ‘আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ তাঁরা নেননি। উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি ছোট নাগরিক সংগঠন। আর আমাকে স্বাগত জানিয়েছে বর্তমান বিজেপি সরকার এবং ডানপন্থীরা। বামপন্থীরা যে কাজটি করেননি, তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরা সেই কাজটি করেছেন। এই সত্যই আসলে তাঁদের অসহ্য হয়ে উঠেছে। একজন ধর্মনিরপেক্ষ নারীবাদী লেখককে বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছিল। উনিশ বছর পর সেই লেখককেই স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি সরকার। এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য তাঁদের আত্মমূর্তিতে আসলে আঘাত করেছে। তাই নিজেদের ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়ে তাঁরা আমাকে বিজেপির লোক বানাতে ব্যস্ত।’
তসলিমার (Taslima Nasrin) প্রশ্ন, ‘আমার ভাষণ নিয়ে কেন বামেরা একটি কথাও বলছেন না? আমার ভাষণের একটি বাক্য উদ্ধৃত করে দেখান, আমি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছি। কোথায় আমি আমার আদর্শ থেকে এক ইঞ্চি সরে গিয়েছি? কোথায় আমি ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর সমানাধিকার, মানববাদ, যুক্তিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেছি? বামপন্থীরা মঞ্চে বসলে কি আমি কমিউনিস্ট হয়ে যেতাম? তাহলে বিজেপির লোকেরা মঞ্চে বসলে আমি বিজেপি হয়ে গেলাম কী করে? একই মঞ্চে বসা মানে একই মতাদর্শে দীক্ষা নেওয়া নয়। কারও আমন্ত্রণ গ্রহণ করা মানে তাঁর সব রাজনৈতিক মতগ্রহণ করা নয়। আবারও বলছি, কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কিন্তু আমার বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা না করে তাঁরা মঞ্চের অতিথিদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে আমার পরিচয় নির্ধারণ করছেন। এ যুক্তি নয়, এটা গোষ্ঠী-রাজনীতি। তাঁরা আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানোর চেষ্টাও করেননি, অথচ যাঁদের তাঁরা পছন্দ করেন না, তাঁরাই আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বিষোদ্গারের আসল কারণ সম্ভবত এটিই।’
অতীতে ফিরে ওই পোস্টে তসলিমার সংযোজন, ‘বামফ্রন্ট সরকার আমাকে আমার প্রিয় শহর থেকে তাড়িয়েছিল। যে কলকাতাকে ভালোবেসে ইউরোপ, আমেরিকার জীবন ছেড়ে আমি বাস করতে এসেছিলাম, সেই কলকাতা থেকে আমাকে রাতারাতি নির্বাসিত করা হয়েছিল। তারপর কেটে গেল উনিশ বছর। আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বামপন্থীরা কী করেছিলেন? ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন? ক্ষমতা হারানোর পর কোনও নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন? কোনও সভা, মিছিল, আবেদন বা প্রতিবাদ করেছিলেন? একবারও কি বলেছিলেন— একজন বাঙালি লেখকের বাংলায় বাস করার, নিজের প্রিয় শহরে ফেরার অধিকার আছে? না, কিছুই করেননি। সম্ভবত তাঁরা চেয়েছিলেন, আমাকে যে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আমি সেখানেই নিঃশব্দে পড়ে থাকি। বিস্মৃত হই। আমার কণ্ঠ মানুষের কাছে আর না পৌঁছক। তাঁরা আমাকে ফিরিয়ে আনবেন না, অন্য কেউ ফিরিয়ে আনলে সেটিও সহ্য করবেন না— এ কেমন রাজনীতি?’
ধোঁয়াশা সরিয়ে তসলিমা স্পষ্ট করেছেন, তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কোনও সরকার, কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও বিশাল সংগঠন নেয়নি। উদ্যোগ নিয়েছিল ছোট একটি সংগঠন— সেক্যুলার মিশন। পরে যার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুটি ছোট সংগঠন— ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন।’ লেখিকার স্পষ্ট কথা, ‘বড় বড় রাজনৈতিক দল এবং বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যে কাজ উনিশ বছরে করতে পারেনি, বস্তুত করার চেষ্টাও করেনি, এই ছোট সংগঠনগুলো সেই বন্ধ দরজা খুলেছে। আর সেই নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বর্তমান বিজেপি সরকার। সরকার আমাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছে। ডানপন্থীরা প্রকাশ্যে আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। এই সত্য স্বীকার করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই। সত্য স্বীকার করলেই কেউ ডানপন্থী হয়ে যায় না।’
তসলিমা জানালেন, ‘সেদিন মঞ্চে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল, কিন্তু বয়সজনিত কারণে আসতে না পারলেও ভিডিও বার্তায় উদারতা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বর্ষীয়াণ লেখক। আমি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডেকেছিলাম, তিনিও বিজেপির সমর্থক নন। তা হলে নাগরিক সংবর্ধনার অনুষ্ঠানটি কী করে বিজেপির অনুষ্ঠান হয়ে গেল? তেত্রিশ বছর ধরে বামপন্থী মহলের একটি বড় অংশ আমার সঙ্গে এই আচরণ করছে। হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমি কথা বললে তাঁদের আপত্তি নেই, ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে একই দৃঢ়তায় কথা বললেই তাঁরা অস্বস্তিতে পড়েন। মুসলিম মৌলবাদীরা যত অন্যায়ই করুক, যত নারী নির্যাতন করুক, যত মুক্তচিন্তকের মাথার দাম ঘোষণা করুক, তাদের সমালোচনা করলে বামপন্থীদের একাংশ সহ্য করতে পারেন না। মুসলিম নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা আর ইসলামি মৌলবাদকে রক্ষা করা এক জিনিস নয়। প্রথমটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। দ্বিতীয়টি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ। যে ধর্মনিরপেক্ষতা এক চোখ দিয়ে হিন্দু মৌলবাদ দেখে, অন্য চোখ দিয়ে ইসলামি মৌলবাদ দেখেও না দেখার ভান করে— সেটি ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, সেটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।’
সেই পোস্টেই তসলিমার সংযোজন, ‘আমি পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছি মাথা নত করে নয়, নিজের বিশ্বাস আরও দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করতে। কলকাতার সাধারণ মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার কাছে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের অনুমোদনের সিলমোহর নিতান্তই তুচ্ছ। না, লজ্জা আমার নয়। লজ্জা তাঁদের— যাঁরা আমাকে তাড়িয়েছিলেন, উনিশ বছর নীরব ছিলেন, আমাকে ফিরিয়ে আনার কোনও চেষ্টা করেননি, আর আজ তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে আমার বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ কোনও রাজনৈতিক দলের জমিদারি নয়। কলকাতাও নয়। পশ্চিমবঙ্গ মানুষের, কলকাতা মানুষের। সেই মানুষের ভালোবাসায় আমি ফিরেছি। আবারও ফিরব।’