শিলাদিত্য সাহা
পারস্য থেকে পালামৌ... শতবর্ষ আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক যাত্রাপথে কখনও কি ম্যানগ্রোভ অরণ্যে বসে দু’দণ্ড জিরিয়েছিল এশিয়াটিক সিংহ? ভেবেছিল কি, সমুদ্রের ধারে নোনা হাওয়া মেখে এখানেও ঘর বাঁধা যায়?
বর্তমানে বাকি সব জায়গা থেকে বিলুপ্ত হয়ে তারা শুধু টিকে আছে ভারতের গুজরাটে, গির অরণ্যে। কিন্তু শুধুই কি অরণ্যে? গত কয়েক বছরের সমীক্ষা দেখিয়েছিল, গির জাতীয় উদ্যানের বাইরে বিরাট অংশে সংসার বাড়ছে এশিয়াটিক সিংহের। সেই গ্রেটার গির ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে যেমন জঙ্গল রয়েছে, তেমনই জুড়েছে উপকূলের একটা বিরাট অংশ। এ বার বিজ্ঞানীদের গবেষণায় গুজরাটে আরবসাগরের তীরে সেই উপকূল এলাকাতেই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে প্রামাণ্য ছবি উঠল সিংহের।
একই সঙ্গে ভারতের মুকুটেও জুড়ে গেল অনন্য একটি পালক। বিশ্বে ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে বাঘ একমাত্র এ দেশে মেলে, সেটা সুন্দরবনে। এ বার ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবি জানিয়ে দিল, বিশ্বে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে সিংহের একমাত্র বাসস্থানও এখানে। আফ্রিকার নামিবিয়াতেও স্কেলিটন কোস্ট পার্ক এলাকায় উপকূলীয় সিংহের (কোস্টাল লায়ন) বসবাস আছে ঠিকই, তবে সেখানে ম্যানগ্রোভ নেই। গির অরণ্যের শীর্ষ বনাধিকারিকদের মতে, যে হারে সিংহের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে এশিয়াটিক সিংহের একটা বড় অংশকে ম্যানগ্রোভ–সহ গুজরাটের উপকূল জুড়ে পাওয়া গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
বিজ্ঞান পত্রিকা ‘দ্য জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অফ কলকাতা’য় সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাপত্র ‘ফ্রম ফরেস্ট টু শোর: ট্রেসিং দ্য এশিয়াটিক লায়ন্স জার্নি ইনটু ম্যানগ্রোভ হ্যাবিট্যাট’ অনুযায়ী গুজরাটের উপকূল এলাকার ম্যানগ্রোভ অরণ্যে দিব্যি বসবাস করছে সিংহের দল। এমনিতে গুজরাটে জুনাগড়, আমরেলি, গির–সোমনাথ এবং ভাবনগর জেলার প্রায় তিন হাজার কিমি উপকূল এলাকায় সিংহের দেখা মেলে। এক্ষেত্রে গবেষকরা ২০২৪–এর জানুয়ারি থেকে জুন রাজ্যের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে গ্রেটার গির ল্যান্ডস্কেপের আমরেলি জেলায় দক্ষিণ–পূর্ব উপকূলে (রাজুলা–জাফরাবাদ–নাগেশ্রী অঞ্চল) ১০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসান আরবসাগরের তীরে, ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে। ১৫ দিনের ব্যবধানে টানা ১০ দিন করে তিন বার বসানো হয়েছিল ক্যামেরাগুলি। সমীক্ষা শেষে গবেষকরা সেখান থেকে মোটামুটি ৪টি এশিয়াটিক সিংহের ৪৫টি ছবি পান। সেখানে শুধু পূর্ণবয়স্ক নয়, সাবঅ্যাডাল্ট এবং সিংহ শাবকও ছিল। শুধু যে ক্যামেরায় তাদের ছবি এসেছে এমন নয়। ম্যানগ্রোভের কর্দমাক্ত মাটিতে পায়ের ছাপ, গাছে আঁচড়ের দাগ, মলের (স্ক্যাট) নমুনা — সবই পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ঘটনা হলো, যে উপকূল এলাকায় ম্যানগ্রোভে সিংহের দেখা মিলেছে, সেখানে সিংহের বংশবৃদ্ধির হারও গিরের মোট গড়ের চেয়ে বেশি। ২০২০–এর সিংহ শুমারিতে গুজরাটের দক্ষিণ–পূর্ব উপকূলের রাজুলা–জাফরাবাদ–নাগেশ্রী অঞ্চলে ৬৭টি সিংহের সন্ধান মেলে। আর ২০২৫–এর সমীক্ষায় সেই সংখ্যাটাই বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪। বৃদ্ধির হার ৪০%! এ দিকে গির জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য–সহ ১১টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা সমগ্র গ্রেটার গির ল্যান্ডস্কেপ মিলিয়ে ২০২০–২০২৫ সময়ে সিংহের সংখ্যা ৬৭৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯১। বৃদ্ধির হার ৩২%। উল্লেখযোগ্য যে, গুজরাটের কোস্টাল লায়নরা সমুদ্রের ধারে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে গিরের জঙ্গলের মতো বড় শিকার পায় না। আশপাশে জনবসতি না–থাকায় গবাদি পশু শিকার করার সুযোগও নেই। তাদের কপালে জোটে বুনো শুয়োর–সহ তুলনায় ছোটখাটো জন্তু। অথচ এমন আপাত প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের বংশবৃদ্ধির হার ভালো। তুলনায় গিরের মূল সংরক্ষিত অরণ্য এলাকায় প্রায় চারশো সিংহ থাকলেও সেখানে বৃদ্ধির হার মোটে ২০%।
মনে করা হচ্ছে, এই তারতম্যের মূল কারণ কনফ্লিক্ট বা সংঘাত পরিস্থিতি। গুজরাটের বনাধিকারিকদের বক্তব্য, উপকূল এলাকায় সিংহকে গিরের জঙ্গলের মতো এলাকা দখলের লড়াই করতে হচ্ছে না। তাদের জনবসতি বা শহুরে জনপদের কাছাকাছি গিয়ে খাবার খুঁজতে হচ্ছে না। নগরায়নের ফলে সিংহের বাসস্থান হারানোর বা পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুরও ভয় নেই। জঙ্গল থেকে উপকূলে যাতায়াতের পথ (করিডর) সুরক্ষিত থাকলে ম্যানগ্রোভে ঘেরা উপকূল এলাকায় নোনামাটি, বছরে প্রায় ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টি, শ্বাসমূলী উদ্ভিদের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে এশিয়াটিক সিংহ।
গুজরাট উপকূলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে সিংহের অবস্থানের বিষয়টি প্রথমবার গুজরাট বন দপ্তরের নজরে এসেছিল ২০১৯ সালে। তার পরে ২০১৯ থেকে ২০২১ — এই দু’বছরে ১০টি কোস্টাল লায়নের গলায় স্যাটেলাইট রেডিয়ো কলার পরিয়ে তাদের পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তখনই দেখা যায়, গুজরাটের দক্ষিণ–পূর্বে আরবসাগর উপকূলের যে যে অংশে ছোট ম্যানগ্রোভ ‘প্যাচ’ রয়েছে, সেখানে সিংহের ঘণত্ব (ডেনসিটি) বাকি উপকূল এলাকার থেকে বেশি। ২০২৫–এর রাজ্যওয়াড়ি শুমারির ফলেও দেখা গিয়েছে, উপকূলে সিংহ বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে তাদের ঘোরাফেরার ছবিও সেই পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্রের প্রমাণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।