• ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ মিছিলে পেলেটে আহত হয়েছিলেন কতজন? RTI-তে মিলল নতুন তথ্য
    এই সময় | ১১ আগস্ট ২০২৬
  • ২০ জুলাই দিল্লিতে পড়ুয়াদের ‘সংসদ চলো’ মিছিলে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ আরও জোরালো হলো। তথ্য জানার অধিকার (RTI) আইনে পাওয়া হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, ওই দিন অন্তত ১০ জন আন্দোলনকারী পেলেট (ছররা গুলি), শট বা প্রজেক্টাইলের আঘাত নিয়ে দিল্লির দুই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এত দিন পর্যন্ত এই ঘটনায় পাঁচ জনের পেলেটবিদ্ধ হওয়ার কথা সামনে এসেছিল। কিন্তু RTI-থেকে প্রাপ্ত নতুন তথ্য অনুযায়ী আহতের সংখ্যা অন্তত দ্বিগুণ।

    তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ এবং দলের জাতীয় মুখপাত্র সাকেত গোখলে এই তথ্য সামনে এনেছেন। তাঁর করা RTI-এর জবাবে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল জানিয়েছে, ২০ জুলাই সেখানে পেলেট, শট বা প্রজেক্টাইলের আঘাত নিয়ে অন্তত ৯ জন ভর্তি হয়েছিলেন। অন্যদিকে সফদরজং হাসপাতাল জানিয়েছে, একই দিনে পেলেটের আঘাত নিয়ে আসা এক তরুণের চিকিৎসা করা হয়েছিল। ফলে দুই হাসপাতালের নথি মিলিয়ে পেলেটে আহতের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে অন্তত ১০।

    RTI-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজে মোট ৮১ জন আহতকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৪৬ জন ছিলেন আন্দোলনকারী এবং ৩৫ জন পুলিশকর্মী। হাসপাতালের নথিতে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীরা নিজেরাই হাসপাতালে এসেছিলেন, আর আহত পুলিশকর্মীদের তাঁদের সহকর্মী নিয়ে গিয়েছিল।

    আহতদের মধ্যে ১৪ জনের মাথা ও মুখে আঘাত ছিল। পাঁচ জনের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। আরও ৩৬ জনের শরীরে কাটা-ছেঁড়া ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এক জনের চোখ, শ্বাসযন্ত্র ও ত্বকে গুরুতর আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নয় জনের ক্ষেত্রে ‘pellet, shot or projectile injuries’ বা পেলেট, ছররা গুলি কিংবা প্রজেক্টাইল জাতীয় আঘাতের উল্লেখ রয়েছে।

    ৭ অগস্টের RTI জবাবেও সফদরজঙ্গ হাসপাতালের ২০ জুলাইয়ের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, ওই দিন পেলেটের আঘাত নিয়ে এক জন রোগী হাসপাতালে এসেছিলেন। হাসপাতালের নথিতে সেটিকে ‘pellet injury – 1 case’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি যন্তর মন্তর বা তার আশপাশে আহত হওয়ার কথা জানিয়ে মোট ২৯ জন—২৫ জন পুলিশকর্মী এবং চার জন আন্দোলনকারী—হাসপাতালে এসেছিলেন বলে RTI-তে জানানো হয়েছে।

    ২০ জুলাইয়ের মিছিল ঘিরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনে সামিল হওয়া পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি তাঁদের লক্ষ্য করে পেলেটও ছোড়া হয়েছিল। তবে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, রাজধানীতে ওই দিন পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করেনি।

    তবে পেলেট গান র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF)-এর অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ। ফলে ২০ জুলাইয়ের ঘটনার ক্ষেত্রে RAF-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যেই সংসদ মার্গ থানার একটি জেনারেল ডায়েরি এন্ট্রি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে RAF-এর তরফে অ্যান্টি-রায়ট গান এবং প্লাস্টিক পেলেট ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

    ২২ জুলাই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনীর (CRPF) বিশেষ শাখা 'ব়্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স' (RAF)-এর দায়ের করা ওই জিডি এন্ট্রি অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকের নির্দেশেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স অ্যান্টি-রায়ট বন্দুক থেকে দুই রাউন্ড ছররা বা পেলেট ফায়ার করেছিল। এমনই দাবি করা হয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদনে। রাজধানীতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের দমনে পেলেট গান ব্যবহারের নজির এই প্রথম।

    প্রকাশিত ওই নথি অনুযায়ী, ২০ জুলাই CJP-এর প্রতিবাদ সামাল দিতে RAF ৫৫ রাউন্ড নন-ইলেকট্রিক্যাল শেল, ১৫ রাউন্ড ইলেকট্রিক্যাল শেল, পাঁচটি কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড, অ্যান্টি-রায়ট গান থেকে দুই রাউন্ড এবং প্লাস্টিক পেলেটের দুই রাউন্ড ব্যবহার করেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

    RTI-র তথ্য প্রকাশ করে সাকেত গোখলে দাবি করেছেন, এত দিন ২০ জুলাইয়ের যন্তর মন্তর বিক্ষোভে পাঁচ জনের পেলেট-আঘাতের কথা জানা গেলেও হাসপাতালের রেকর্ডে আক্রান্তের সংখ্যা অন্তত ১০ বলে নিশ্চিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, হাসপাতালের নথি সামনে আসায় ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

    তবে এখনও সব সরকারি হাসপাতালের তথ্য হাতে আসেনি। সাকেত গোখলের RTI-র ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS), রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাব এখনও আসেনি। ফলে ২০ জুলাইয়ের ঘটনায় পেলেট বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে আহতের মোট সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

    পেলেট লেগে এক আন্দোলনকারীর চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরেই ২০ জুলাইয়ের পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সংবাদমাধ্যমের সামনে এক ছাত্রকে হাজির করেছিলেন। ওই ছাত্র দাবি করেছিলেন, মিছিলের সময় পেলেটের আঘাতে তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে।

    পেলেট গানকে ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলেও চিকিৎসকরা এর গুরুতর ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। চোখ, স্নায়ু, রক্তনালী, হাড় বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পেলেট লাগলে স্থায়ী ক্ষতি এমনকি প্রাণহানিও হতে পারে। ২০ জুলাইয়ের ঘটনার পরে দিল্লিতেও এই অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

    ভারতে জনতা নিয়ন্ত্রণে পেলেট গান ব্যবহারের বিতর্ক নতুন নয়। জম্মু-কাশ্মীরে এর ব্যবহারের পর গুরুতর চোখের আঘাত ও স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর বহু ঘটনা সামনে এসেছিল। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে পেলেট গান ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা বাহিনীকে পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথভাবে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছিল। পরের বছর কেন্দ্রও শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছিল, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গানকে ‘শেষ অবলম্বন’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

    ফলে রাজধানী দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভ সামলাতে আদৌ পেলেট বা প্লাস্টিক পেলেট ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কে নির্দেশ দিয়েছিল এবং পরিস্থিতি কতটা গুরুতর ছিল—এই তিনটি প্রশ্নই এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

    ২০ জুলাইয়ের ঘটনার পর থেকেই প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক চলছে। একদিকে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে, অন্যদিকে হাসপাতালের RTI-উত্তর এবং পুলিশের জেনারেল ডায়েরির তথ্যের মধ্যে এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছে যা সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

    এখনও AIIMS এবং রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের রিপোর্ট সামনে এলে আহতের সংখ্যা আরও বাড়ে কি না, সেটিই নজরে। পাশাপাশি ২০ জুলাইয়ের ঘটনায় কোন বাহিনী ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছিল এবং সেই ব্যবহারের অনুমোদন বা নির্দেশ কোথা থেকে এসেছিল, তা নিয়েও বিস্তারিত তদন্তের দাবি উঠছে।

  • Link to this news (এই সময়)