• ক্ষুদিরামের আত্মবলিদানই সুভাষচন্দ্রের অনুপ্রেরণা, গায়ে কাঁটা দেওয়া অগ্নিযুগের গল্প
    প্রতিদিন | ১২ আগস্ট ২০২৬
  • ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট দিনটিকে ভুলবে বাংলা, ভুলবে না ভারত। সেদিন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। পরাধীনতা অস্বিকার করা বিপ্লবীর বয়স তখন খাতায়কলমে ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন। জানা কথা যে মুজাফ্ফুরপুরের অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে মারার উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। ভুলবশত সেই হামলায় মৃত্যু হয় দুই ব্রিটিশ নারীর। কিন্তু সব ভুল যে ভুল নয়, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ ক্ষুদিরাম বসু। কেন?

    ইংরেজের বিরুদ্ধে ক্ষুদিরামের বিপ্লব, হাসিমুখে মৃত্যুবরণ অনুপ্রাণিত করেছিল দেশের তৎকালীন নব্যপ্রজন্মকে। তাঁদের অন্যতম কটকের বাসিন্দা এক কিশোর। ব্যারিস্টার জানকীনাথ বসুর সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু। একদিন যিনি গোটা দেশের ‘নেতাজি’ হবেন। প্রশ্ন হল, সুভাষচন্দ্রকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন ক্ষুদিরাম?

    ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর। সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। অর্থাৎ কিনা ক্ষুদিরাম ছিলেন সুভাষচন্দ্রের চেয়ে বারো বছরের বড়। সুভাষের বয়েস যখন এগারো বছর তখন ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। ১৯০৮-এর ১১ আগস্টের সেই বেদনাদায়ক খবর আগ্নেয়গিরির লাভার মতো আসমুদ্রহিমাচলে ছড়িয়েছিল। সেদিন এগারো বছরের ছোট্ট সুভাষচন্দ্র খুব কেঁদেছিলেন।

    ১৯০৯ সালে কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন সুভাষ। এই গল্প পরের বছর, অর্থাৎ ১৯১০-এর। ব্রিটিশ সরকারের কড়া নির্দেশ জারি করে— কোনও বিপ্লবীর ছবি ঘরে রাখা যাবে না। দোকানেও বিক্রি করা যাবে না। যদিও মাত্র তেরো বছরের কিশোর সুভাষ ছিলেন দেশাত্ববোধে উদ্বুদ্ধ। একই মানসিকতার বন্ধুও জুটে গিয়েছিল তার। সুভাষের নেতৃত্বে তারা ঠিক করেন ১১ আগস্ট শহিদ ক্ষুদিরামের ফাঁসি দিবস পালন করবেন। ওইদিন বিপ্লবীকে স্মরণ করতে তারা উপবাস করবেন। এমনি উপবাস না, পুরো নির্জলা।

    সুভাষ বন্ধুদের জানান, প্রয়াণ দিবসে আমরা সকলে মিলে ক্ষুদিরামের গলায় মালা দেবো। সারাদিন তাঁর ছবির সামনে বসে থাকব। সমস্যা হল ক্ষুদিরামের ছবি জোগাড় করতে গিয়ে। কোথায় মিলবে ছবি? নির্দয় শাসক ইংরেজের ভয়ে কারো ঘরেই যে বিপ্লবীদের ছবি নেই। একই কারণে দোকান-বাজারেও মিলছে না ছবি। সুভাষ বন্ধুদের সাহস দেন, যেখান থেকে হোক ক্ষুদিরামের ছবি নিয়ে আসব। সেই কাজে কটক শহরের দ্বারে দ্বারে ঘোরে সে। যদিও হতাশ হয়। কোথাও মিলছিল না ক্ষুদিরামের ছবি। অবশ্য সুভাষও দমবার পাত্র নয়।

    জানা যায়, কটক শহরের একদম শেষপ্রান্তে একটি কুঁড়েঘরে ক্ষদিরামের ছবি আবিষ্কার করেন সুভাষচন্দ্র। সেই কুঁড়েঘরের দরজা নাড়তেই এক বৃদ্ধ বেড়িয়ে আসেন। তিনি তাঁর আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় সুভাষ বলে— আপনার কাছে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ছবি আছে? বৃদ্ধ প্রশ্ন করেন কেন? সুভাষ উত্তরে বলে– আমরা ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি দিবস পালন করব। এরপর বৃদ্ধ ঘরে অতি যত্ন রাখা ক্ষুদিরামের একটি ছবি সুভাষের হাতে তুলে দেন। এইসঙ্গে আশীর্বাদ করেন—- তুমিও একদিন ভারতের মুখ উজ্জ্বল করবে।

    পরদিন ১১ আগস্ট স্কুলের বাইরে একটি গাছের নিচে শ্রদ্ধার সঙ্গে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি দিবস পালন করেন সুভাষ ও তার বন্ধুরা। বিষয়টি নজরে পড়ে স্কুলের এক শিক্ষক বেণীমাধব দাসের। তিনি ছাত্র সুভাষকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলেন। আসলে বেণীমাধব দাসও ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। ছাত্র সুভাষচন্দ্র বসুকে যিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যদিও সুভাষের আসল অনুপ্রেরণা ছিল ক্ষুদিরাম বসু। হয়তো সেই কারণেই ভবিষ্যতের ভারত ‘নেতাজি’কে পেয়েছিল।
  • Link to this news (প্রতিদিন)