• পুকুরে জাল ফেললেই টাটকা ইলিশ, অসাধ্য সাধন করতে চলেছেন ব্যারাকপুরের CIFRI-এর বিজ্ঞানীরা
    এই সময় | ১৩ আগস্ট ২০২৬
  • সৌমেন রায়চৌধুরী

    ইলিশ হলো বাঙালির ডেসডিমোনা। অদৃশ্য বেহালায় ছড় টানে মন, ‘তোমারে সঁপেছি প্রাণ ওগো...।’ ভরা বর্ষায় পাত সাজিয়ে বসে সমঝদার ভোজনরসিক।

    কিন্তু ইলিশে যত না কাঁটা, তার চেয়ে বেশি কাঁটা দামে। বড় সাইজ়ের এক কেজি কিনতে কমপক্ষে আড়াই হাজার খসাতে হয়। খোকা ইলিশও ৯০০-র কমে মেলে না। দামের ছ্যাঁকায় প্রেম উবে যায়। বাঙালি দার্শনিক হয়ে ওঠে। কল্পনাবিলাসী কেউ কেউ তো এও ভেবে বসেন, ‘আহা, ইলিশ যদি পুকুরে হতো!’

    এ কি বড় বেশি চাওয়া? বর্ষার মেঘ ডাকলে আর গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। বাড়ির পাশে পুকুরে ঢেউ তুলে ঘুরে বেড়াবে ইলিশ। তোলো আর খাও। মুখে একগাল হাসি নিয়ে ব্যারাকপুরের কেন্দ্রীয় অন্তঃস্থলীয় মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র ICAR-CIFRI-এর প্রধান শ্রীকান্ত সামন্ত বললেন, ‘সম্ভব।’ জানালেন, বদ্ধ জলাশয়ে ইলিশকে বড় করে তোলার পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন তাঁরা। এ যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই।

    ইলিশের সঙ্গে নদীর জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। তার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা সব স্রোতের বুকেই। বদ্ধ জলাশয়ে তার লালনপালন মুখের কথা নয়। গত কয়েক বছর ধরে সেই অসাধ্য সাধনের কাজটাই করে চলেছেন CIFRI-র বিজ্ঞানীরা। রহড়া কেন্দ্রে চলছে পরীক্ষানিরীক্ষা। পাশাপাশি কোলাঘাট ও কাকদ্বীপে গবেষণার কাজও সমানতালে এগোচ্ছে।

    ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক খাবারদাবারের পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটন এবং পুষ্টিকর ফিড। জলের গুণমান, অক্সিজেনের মাত্রা—সব কিছুর উপর রাখা হচ্ছে কড়া নজর। বদ্ধ জলে একটু একটু করে বড় হচ্ছে ইলিশ। মা-বাবার মতো তার পরিচর্যা করছেন CIFRI-র বিজ্ঞানীরা।

    ইলিশের বাড়বাড়ন্ত বাচ্চার মতো নয়। সময় লাগে। প্রথম বছরে ওজন থাকে ১৫০ গ্রামের আশপাশে। পরের বছরে সেটা ৩০০-৪০০ গ্রামে পৌঁছে যায়। বাজারে যে ইলিশ পাওয়া যায়, সেগুলো কমপক্ষে তিন-সাড়ে তিন বছরের। বিজ্ঞানীরা বদ্ধ জলাশয়ে বড় করেছেন এক কেজির ইলিশ। ৯৯২ গ্রাম।

    এটাকে নিছক ওজন ভাবলে মস্ত ভুল হবে। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অসীম সম্ভাবনা। প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে আবদ্ধ জলেও ইলিশকে বড় করে তোলা সম্ভব। তবে শ্রীকান্ত বলছেন, ‘মাইলস টু গো...। পুকুরের জলে ইলিশের সম্পূর্ণ প্রজনন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। সেই পরীক্ষাতেও সাফল্য এলে খুলে যেতে পারে নতুন দরজা।’

    তবে পুকুরে বাণিজ্যিক ভাবে ইলিশ চাষ সম্ভব, এ কথাটা এখনই বুক ঠুকে বলতে চাইছেন না বিজ্ঞানীরা। সম্ভাবনার বীজ যদিও পুঁতে দেওয়া হয়েছে। অনেক মৎস্যচাষীও আগ্রহী। একদিন হয়তো রুই, কাতলা, মৃগেলের সঙ্গে জালে উঠবে ইলিশও। তখন প্রতিদিন পাতে টাটকা ইলিশ। অনেকটা স্বপ্নের মতো।

    তবে এতটা আশাবাদী নন CIFRI-এর বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, ইলিশের শরীরে পটকা না থাকায় অক্সিজেনের প্রয়োজন বেশি হয়। তাই এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে সরানোটা খুব ঝুঁকির। সবচেয়ে বড় কথা হলো, জলের মান ঠিক রাখা দরকার। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করাও জরুরি।

    ইলিশের স্বাদও কিন্তু বড় কথা। পদ্মার ইলিশকে টেক্কা দিতে গিয়ে কমলকুমার মজুমদার সেই কবে বলেছিলেন, ‘গঙ্গার ইলিশ দু’শো বছর ধরে কোম্পানির তেল খেয়েছে। এর সঙ্গে অন্য ইলিশ পাল্লা দেবে কী করে?’ ও পার বাংলা থেকে পাল্টা আওয়াজ উঠেছিল, এ কথা বলা আর লেনিন মার্ক্সবাদ বোঝেন না বলা একই ব্যাপার। কিন্তু পুকুরের ইলিশ? তার স্বাদ কেমন হবে? CIFRI-এর বিজ্ঞানীরা মুচকি হেসে বলছেন, ‘লা জবাব।’

  • Link to this news (এই সময়)