• মদ্যপানে কড়াকড়ি, গাঁজায় ঝুঁকছেন পাইলটরা!
    এই সময় | ১৩ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: এলোমেলো গাড়ি চালালে চালককে প্রশ্ন করাই যায়, ‘কী ব্যাপার! গাঁজা খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন নাকি!’

    ফ্লাইটে বসে সামান্যতম ঝাঁকুনি বা ল্যান্ডিংয়ের সময়ে দুলে উঠলে এ বার কি পাইলটের দিকেও ছিটকে আসবে সেই প্রশ্ন? সিনিয়র পাইলটদের অভিযোগ, তাঁদের একাংশের মধ্যে গাঁজা খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষত কমবয়সীদের মধ্যে।

    যার হাতে–গরম প্রমাণ মিলেছে ৪ অগস্ট ফুকেট–দিল্লি এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে। ওডিশার আকাশে আচমকাই ৩০০ ফুট নীচে নেমে আসে সেটি। কেবিন ক্রু ও যাত্রী মিলিয়ে আহত হন প্রায় ১৭ জন। পরে মেডিক্যাল টেস্টে দেখা যায় বিমানের মুখ্য পাইলট গাঁজা খেয়ে উঠেছিলেন! তিনি নিয়মিত ঘুমের ওষুধও খেতেন বলে জানা গিয়েছে। যত দিন যাচ্ছে, সে দিনের ফ্লাইটে কম্যান্ডার পাইলটের বেসামাল অবস্থার যে সব অভিযোগ সামনে আসছে, তাতে চোখ আকাশে উঠে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

    অভিযোগ, টেক–অফের কিছুক্ষণ পরে নেশার ঘোরে ককপিটের মেঝেতে বসে পড়েছিলেন পাইলট। পরে খানিকটা সময় আবার দাঁড়িয়ে ছিলেন কো–পাইলটের সিটের পিছনে। সিনিয়র পাইলটদের কথায়, কো–পাইলটের সিটের পিছনে অনেকগুলি কন্ট্রোল–লিভার থাকে। সেখানেই বেসামাল পাইলটের হাত লেগে তিন বার হাইড্রলিক ফেলিওর হয়েছিল বলে তাঁদের মনে হচ্ছে। সূত্রের খবর, বিমানটি যখন হু হু করে নীচে নেমে আসছিল তখন নেশাগ্রস্ত পাইলট নিজেও ককপিটে ছিটকে পড়েন। তবে, তখন কো–পাইলটকে তিনি যে নির্দেশ দেন, তা একেবারে সঠিক ছিল বলেও মনে করছেন সিনিয়র পাইলটেরা।

    সূত্রের দাবি, আত্মপক্ষ সমর্থনে পাইলটের দাবি, তিনি গাঁজা খাননি। আগের কয়েকদিন ডিউটির কারণে ভালো করে ঘুম না হওয়াই এর কারণ। নারকো–টেস্ট পজ়িটিভ এসেছে কিছু ওষুধ খাওয়ার ফলে।

    পাইলটদের বড় অংশের দাবি, বড়সড় দুর্ঘটনা থেকে সে দিন রক্ষা পাওয়া গিয়েছে। কারণ, মাত্র দু–তিন মিনিটের ব্যবধানে প্রায় ১১টি অ্যালার্ম এসেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু হাইড্রলিক ফেলিওরই নয়, তার জন্য বিমানের অটো–পাইলট সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বিমানের ভিতরের এয়ার–প্রেশারও গন্ডগোল করতে শুরু করে। যদিও ৩০০ ফুট নীচে নেমে আসার পরে বিমানটির সমস্ত সিস্টেম আবার ঠিকঠাক কাজ করতে শুরু করে। অবসর নেওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট সুমন্ত রায়চৌধুরীর প্রশ্ন, ‘নিয়ম মেনে তখন ভুবনেশ্বর বা কলকাতায় ডাইভার্ট করার কথা ছিল পাইলটের। সেটা না করে আহত যাত্রীদের নিয়ে কেন দিল্লি উড়ে গেলেন কে জানে! হয়তো গাঁজা খেয়ে ছিলেন বলেই।’

    ক্যাপ্টেন সুমন্তর কথায়, ‘মদ খেলে তো ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকছে। ব্রেদালাইজ়ার (বিএ) টেস্টে সহজেই ধরা পড়ে তা। কিন্তু, গাঁজা খেলে কী করে ধরবে?’ ভারতের আকাশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ)–র এক কর্তা জানাচ্ছেন, গত এক বছরে মদ খেয়ে বিমান চালানোর অপরাধে দুই পাইলটের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সেই কর্তার কথায়, ‘ফ্লাইটে ওঠার আগে, কখনও পরে বিএ টেস্ট হয়। কিন্তু, গাঁজা বা কোকেন খেয়ে উঠলে তা ধরার উপায় নেই। প্রত্যের ফ্লাইটের আগে তো ব্লাড বা ইউরিন টেস্ট করা সম্ভব নয়।’ সুমন্তর কথায়, ‘এ ক্ষেত্রেও ধরা পড়ত না। বিমান ৩০০ ফুট পড়ে না গেলে হয়তো পাইলটের মেডিক্যাল পরীক্ষাও হতো না। হয়তো এখন অনেকেই গাঁজা খেয়ে ককপিটে বসছেন। কী করে বুঝবেন?’

    ডিজিসিএ–রও একটি সূত্র জানাচ্ছে, বিএ টেস্টে পাইলটেরা পর পর ধরা পড়ার পরে, মদ ছেড়ে গাঁজা–সহ অন্য মাদক খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছিল। ২০২১–এ ছ’টি গ্রুপের ড্রাগের কথা বলে পাইলটদের সতর্ক করা হয়। তার মধ্যে গাঁজা ও কোকেনও রয়েছে। কিন্তু, প্রতিটি ফ্লাইটের আগে যেমন বিএ টেস্ট হয়, সেরকম গাঁজা পরীক্ষার কোনও ডিভাইস নেই। ফুকেট–দিল্লি ফ্লাইটের ঘটনা নিয়ে এখন নিয়মিত উড়ে বেড়ানো এক সিনিয়র পাইলটের কথায়, ‘স্টুপিডের মতো কাজ। কেউ করে! ওকে (অভিযুক্ত পাইলটকে) রিহ্যাবে পাঠানো হবে। কিন্তু, যে রেপুটেশন লস হলো, তা আর কখনও ফিরে পাবে? হি মাইট লুজ় দ্য জব।’ ডিজিসিএ–র নিয়মও বলছে, কোনও পাইলট মাদক সেবন করে ধরা পড়লে তাঁকে প্রথমে রিহ্যাবে পাঠাতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে, বেসরকারি এয়ারলাইন্স রিহ্যাবে পাঠিয়ে কি সেই পাইলটের চিকিৎসা করাবে?

  • Link to this news (এই সময়)