সৌমিত্র ঘোষ, বালি
স্বাধীনতা সংগ্রামী ও গান্ধীবাদী কংগ্রেস নেতা স্মৃতীশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভুলতে বসেছেন বালির মানুষ। তিনি আদতে উত্তরপাড়ার বাসিন্দা হলেও তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র ছিল বালি। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গার সময় মল্লিকবাজার পার্ক সার্কাস এলাকায় শান্তি মিছিল করতে গিয়ে দাঙ্গাবাজদের হাতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে তাঁর স্মরণে বালিতে তৈরি হয় স্মৃতীশ স্মৃতিরক্ষা কমিটি। তাদের উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালের ২১ নভেম্বর বালিখালে রাস্তার মাঝখানে একটি শ্বেত পাথরের আবক্ষ মূর্তি এবং স্মৃতিফলক বসানো হয়েছিল। যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাজ্যপাল কৈলাশনাথ কাটজু। পরে সেখানে একটি পার্ক তৈরি করা হয়। সেই স্মৃতিচিহ্নটুকুও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সম্প্রতি জিটি রোডের উপরে অবস্থিত সেই পার্কটিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই পার্কের ভিতরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামী স্মৃতীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্বেতপাথরের আবক্ষ মূর্তিটি।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, যান চলাচলের সুবিধের জন্য রাস্তা চওড়া করতেই পার্কটি কেটে ছোট করা হয়েছে। মূর্তির চারিদিকে ছোট পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হচ্ছে। যদিও বালি ও উত্তরপাড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, স্মৃতীশের মূর্তিটি যথাযথ সংরক্ষণ করা হোক এবং তাঁর আত্মত্যাগের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক।
ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলায় সাম্প্রদায়িক হানাহানি রুখতে স্মৃতীশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি বরাবরই গান্ধীজির আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। অথচ, সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে গিয়ে নিজের প্রাণ বলিদান দিয়েছিলেন তিনি।
তাঁর জন্ম ১৯১০ সালে। খুব অল্প বয়সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। এক সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। হুগলি জেলায় কৃষক ও খেতমজুরদের সংগঠিত করার কাজ করেছেন। বহু বার ইংরেজ সরকারের জেল খেটেছেন। পরে মতপার্থক্যের কারণে কমিউনিস্ট পার্টির সংশ্রব ত্যাগ করেন। বালিতে কংগ্রেস সংগঠন গড়ার কাজে মন দেন। তাঁর কর্মজীবনের অনেকটাই বালিতে কেটেছে।
সময়টা ছিল ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। কলকাতার কিছু এলাকায় তখন পুরো মাত্রায় দাঙ্গা চলছে। তার জন্য গান্ধীজি তখন বেলেঘাটার হায়দার-এ-মঞ্জিলে অবস্থান করছিলেন। ১ সেপ্টেম্বর বেলেঘাটায় দাঙ্গা রুখতে গিয়ে ছুরিতে আহত হলেন গান্ধীবাদী নেতা শচীন্দ্রনাথ মিত্র। স্মৃতীশের নেতৃত্বে সে সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে জাতীয় প্রদর্শনীর আয়োজন চলছে। ১ সেপ্টেম্বর সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল।
এরই মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়ে যাওয়ায়, বাতিল হয়ে যায় কর্মসূচি। ৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শান্তি মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। শান্তি মিছিল পার্কস্ট্রিট লোয়ার সার্কুলার রোড মোড়ের কাছে পৌঁছতেই, হামলা শুরু করে দাঙ্গাবাজরা। তাতে স্মৃতীশ আক্রান্ত হলেন। পরপর দু'বার তাঁকে ছুরি মারা হয়।
স্মৃতীশ দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিলেন। পরে তাঁকেও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে বালিতে স্মৃতীশ স্মৃতিরক্ষা কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটির উদ্যোগেই প্রতি বছর ৩ সেপ্টেম্বর স্মৃতীশের স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। বালিখালে তাঁর যে মূর্তিটি রয়েছে সেটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের অজস্র ব্যানার ও ফেস্টুনে ঢাকা পড়েছিল। সেখানে কোনও নামফলক না থাকায় অনেকে বুঝতেই পারেন না, সেটি কার মূর্তি। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য হয়তো আগামী দিনে মূর্তিটিকেও সরানো হতে পারে। তার জেরে হারিয়ে যেতে পারে স্মৃতীশে শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও।