• মিউজ়িয়ামকে আদবাসীদের আরও কাছে আনছে বিশ্ববিদ্যালয়, ঢেঁকি শালে ঢেঁকি চালানোর ‘লাইভ ডেমো’র পরিকল্পনা কোথায়?
    এই সময় | ১৩ আগস্ট ২০২৬
  • সুমন ঘোষ

    মিউজ়িয়ামেও বেজে উঠুক মিউজ়িক। ধামসা, মাদল, চাঙের তালে কোমর দোলাক আদিবাসী নারীরা। টুসু, ভাদু, ঝুমুরের সুরে মাতাল হোক আকাশ বাতাস। সেই সুরের মূর্চ্ছনায় পড়ুয়ারা উঁকি মেরে দেখে নিক ইতিহাসে পড়া আদিবাসী সমাজ-সংস্কৃতির খুঁটিনাটি। তবেই সার্থক হবে মিউজ়িয়াম তৈরির উদ্দেশ্য। নয়তো আদিবাসীদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির চার দেওয়ালের মধ্যে সংরক্ষণ করে লাভ কী? এই ভাবনা থেকেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ‘সেন্টার ফর আদিবাসী স্টাডিজ় অ্যান্ড মিউজ়িয়াম’-এর আত্মিক যোগ স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়।

    ঈশ্বচরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে মেদিনীপুর শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। হাতে গোনা কয়েকটি বিষয় নিয়ে পঠনপাঠন শুরু হলেও, বর্তমানে তার বিস্তার ঘটেছে। নতুন নতুন কোর্স চালু, গবেষণা, প্রকাশনা, অনুবাদের কাজ চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নির্মিত, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের সেই সাঁওতাল, লোধা, শবর, ভূমিজ, মুন্ডা, কুড়মি-সহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের সভ্যতা-সংস্কৃতি সংরক্ষণ নিয়েও ভাবনাচিন্তা শুরু হয় ২০১৪ সালে। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর আদিবাসী স্টাডিজ় অ্যান্ড মিউজ়িয়াম’।

    বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতা-সহ বড় বড় মিউজ়িয়ামে সংরক্ষিত নানা জিনিসের সঙ্গে আদিবাসীদের ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী থাকলেও, শুধুমাত্র আদিবাসীদের নিয়ে এমন মিউজ়িয়াম রাজ্যে নেই। আদিবাসী গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাঁদের পুরোনো দিনের সামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে আদিবাসীদের জীবনের সঙ্গে জড়িত কৃষি, শিকার, সঙ্গীত, প্রসাধন সামগ্রী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের দোতলার মিউজ়িয়ামে আদিবাসীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র, পাখি শিকার, মৎস্য শিকারের রকমারি জাল ও ফাঁদ, কৃষিকাজে ব্যবহৃত লাঙল, কোদাল, কুড়ুল, গোরুর গাড়ি, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত মাটি, পাথর, তালপাতা বা বেতের সামগ্রী, রকমারি পোশাক, সাজগোজের জন্য ব্যবহৃত গয়না, নাচগানের জন্য ব্যবহৃত ধামসা, মাদল, চাং থেকে আদিবাসীদের সাহিত্য, ভাষা, লিপি–সহ প্রচুর জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে।

    বর্তমানে মিউজ়িয়ামটি অনেকটাই সমৃদ্ধ। তাই এ বার লক্ষ্য সেই সমস্ত সামগ্রী সাঁওতালি, লোধা, শবর, বীরহোড়দের মতো বিভিন্ন জনজাতির মানুষজনকে দেখানো। তাঁরা আসছেনও বিভিন্ন সময়ে। মিউজ়িয়াম ঘুরে ঘুরে সব দেখছেন। কৌতূহলী হয়ে প্রশ্নও করছেন একের পর এক। লোধা সম্প্রদায়ের জগৎচন্দ্র নায়েক, অবোধ নায়েকরা বলছেন, ‘অনেক কিছু সংরক্ষণ করা হয়েছে ঠিকই, আরও কিছু বাকি রয়েছে। সেগুলোও কিন্তু জরুরি।’ কমলা আড়ি, বালিকা নায়েকরা পুরোনো দিনের পোশাক ও গয়না দেখে কিছুটা বিস্মিতও। বলছেন, ‘গল্প শুনেছিলাম। এ বার চোখে দেখলাম আমাদের পূর্বপুরুষরা, কোন ধরনের জিনিস ব্যবহার করতেন। বেশ ভালো লাগছে।’

    আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরাও কিছু জিনিস সংরক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মিউজ়িয়ামের ডিরেক্টর তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘আমরাও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছি। তাঁদের পরামর্শেই আরও পুরোনো সামগ্রী সংরক্ষণ করার চেষ্টায় রয়েছি। যাতে জঙ্গলমহলে তৈরি করা আমাদের এই মিউজ়িয়াম আরও উন্নতমানের হতে পারে। তা আদিবাসী মানুষ এবং পড়ুয়াদের কাছে আকষর্ণীয় হওয়ার পাশাপাশি পঠনপাঠন ও গবেষণাতেও কাজে লাগে।’ এখন মিউজ়িয়ামে গোরুর গাড়ি ও ঢেঁকি শালে ঢেঁকি চালানোর ‘লাইভ ডেমো’রও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন ডিরেক্টর।

    পরবর্তীকালে যাতে এলাকা ধরে ধরে পড়ুয়াদের এই মিউজ়িয়াম দেখানো যায়, আদিবাসীদের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায়, সে ব্যাপারেও উদ্যোগী হতে চায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন প্রজ‌ন্মকে তাঁদের বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত শেখানোর পাশাপাশি কঠিন পরিস্থিতি থেকে এগিয়ে চলার পথও দেখাতে চান মিউজ়িয়াম কর্তৃপক্ষ। তাঁরা জানাচ্ছেন, পুরোনো দিনের নাচ, নাচের পরিধান দেখিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। পালাগানের বই জোগাড় করে দেওয়া, শিকারের বিভিন্ন ধাপ বুঝিয়ে দেওয়া — সবই করা হবে। কোনও স্কুল বা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক শাখা বা গবেষকেরা চাইলেই নিখরচায় তা দেখতে পারবেন।



    তবে মিউজ়িয়ামের উন্নয়নে আরও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তবেই গ্রামেগঞ্জে গিয়ে স্কুলপড়ুয়াদের বিষয়টি বোঝানো, তাদের নিয়ে এসে মিউজ়িয়াম দেখানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করানো সম্ভব। সে জন্য অর্থ সংগ্রহে বিভিন্ন জায়গায় আবেদনও করা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। মিউজ়িয়াম দেখতে গিয়েছিলেন কেশিয়াড়ির বিধায়ক তথা সাঁওতালি ভাষার শিক্ষক ভদ্র হেমব্রমও। তিনি বলেন, ‘মিউজ়িয়ামটি দেখে ভালো লেগেছে। এটিকে পড়ুয়াদের জন্য কাজে লাগাতে হবে। শিল্প ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের জন্যও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে। আমাকেও ওঁরা সাহায্যের জন্য বলেছেন। আমিও চেষ্টা করব মিউজ়িয়ামের উন্নয়নে যতটা সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার।’

    কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগ যাতে শুধু আঞ্চলিক স্তরের প্রচেষ্টা হিসেবেই সীমাবদ্ধ না থেকে যায়, সে কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মু এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘প্রথমে তো বলব দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। জনগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে ভারতের সাংস্কৃতিক জ্ঞানের মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ইউজিসি অনুমোদিত ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্কে জনগোষ্ঠী বিষয়ক পড়াশোনাকে কেবল ঐচ্ছিক বিষয় না করে কোর পেপার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমান যে পাঠ্যবিষয় রয়েছে, তার মধ্যে জনজাতি সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যেমন কৃষি বা আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়, ভাষাতত্ত্ব, সঙ্গীত। মিউজ়িয়ামের ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা কাটাতে ডিজিটাইজেশন নিয়ে ভাবনচিন্তা করা যেতে পারে। পাশাপাশি এটা ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক যদি গড়ে তোলা যায়। এ রকম কিন্তু ঝাড়খণ্ড, অসমে রয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)