২০০ কোটির মালিক টুলুর খোঁজে গ্রামে গ্রামে মাইকিং পুলিশের, বাড়িতেও লাগানো হল নোটিস
প্রতিদিন | ১৩ আগস্ট ২০২৬
একসময় যে বাড়ির সামনে ছিল স্বাভাবিক ব্যস্ততা, বৃহস্পতিবার সকালে সেই বাড়ির সামনেই দেখা গেল আদালতের কড়া বার্তা। সিউড়ির সুভাষপল্লিতে নাজিবুদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডলের (Tulu Mondal) বিলাসবহুল ‘ডালিলা ভবন’-এর সামনে আদালতের জারি করা হুলিয়ার নোটিশ সাঁটিয়ে গেল পুলিশ। শুধু সিউড়ি নয়, মহম্মদবাজারে টুলুর নামে থাকা বাড়ি ও সম্ভাব্য একাধিক ঠিকানাতেও একই ভাবে নোটিস লাগানো হয়েছে। পাথর খাদান এলাকাতেও টুলুর খোঁজে মাইকিং এবং প্রচার চালানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
আদালতের ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারি এড়াতে আত্মগোপন করেছেন বা নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন বলে আদালতের কাছে জানানো হয়েছে। সেই কারণেই এবার প্রকাশ্যে তাঁর নামে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ জানানো হল। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় এসিজেএম আদালতে হাজির হতে হবে টুলুকে। আদালতের নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ, অপরাধের প্রমাণ নষ্ট বা লোপাট, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। ১০ আগস্ট জারি হওয়া ওই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে হবে তাঁকে।
প্রসঙ্গত, এই মামলার সূত্রপাত ডেউচায় মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায়। পুলিশি তদন্তে ওই ঘটনায় উঠে আসে টুলু মণ্ডলের নাম। এরপর তদন্তের জাল ছড়িয়ে পড়ে একাধিক জায়গায়। টুলুর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রয়েছে বলে সন্দেহ করা প্রায় ২০টি জায়গায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র এবং মামলায় এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ছ’জনের বয়ানকে সামনে রেখে তদন্তকারীরা গোটা ঘটনাকে টুলু মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন একটি ‘সিন্ডিকেট ক্রাইম’ বলে আদালতে দাবি করেছেন। সরকারি পক্ষও আদালতে একই ধরনের অভিযোগের কথা জানিয়েছে। তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়, গ্রেপ্তার এড়াতে টুলু দেশ ছেড়ে বিদেশে আত্মগোপন করেছেন। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে বিচারাধীন।
এই অবস্থায় মামলার বিশেষ সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় টুলুর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারির আবেদন করেছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনেই বৃহস্পতিবার থেকে প্রকাশ্যে নোটিস সাটানো ও প্রচারের কাজ শুরু হয়েছে। টুলুর নামে থাকা বাড়ি, সম্ভাব্য আস্তানা এবং পরিচিত এলাকাগুলিতে আদালতের নির্দেশ প্রচার করা হচ্ছে। মহম্মদবাজারের পাথর খাদান এলাকাতেও পুলিশের তরফে প্রচার চালানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
আদালতের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টুলু হাজির না হলে তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের রাস্তা খুলে যাবে। তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করার পাশাপাশি তাঁকে ঘোষিত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হবে বলে মামলার সঙ্গে যুক্ত সূত্রের দাবি। তবে এর মধ্যেই আইনি লড়াইয়ের অন্য দরজাও খুলে রেখেছেন টুলু। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে দাবি, কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি রক্ষাকবচ চেয়ে আবেদন করেছেন। ফলে নিম্ন আদালতের হুলিয়া, পুলিশের তৎপরতা এবং হাইকোর্টে তাঁর আবেদনের পরিণতি এই তিন দিকের উপরই এখন নজর থাকছে। একদিকে সিউড়ির বিলাসবহুল বাড়ির সামনে আদালতের হুলিয়ার নোটিশ, অন্যদিকে পুলিশের দাবি—অভিযুক্ত বিদেশে আত্মগোপনে। আর মাঝখানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে একটি তারিখ—১৪ সেপ্টেম্বর, সকাল সাড়ে ১০টা। সেই সময় আদালতে টুলু মণ্ডল হাজির হন কি না, নাকি আইনি লড়াইয়ের পথেই এগোবেন, এখন সেটাই দেখার।