উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে আচমকা বালি, পাথর ও জল ঢুকে পড়ার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৭। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৪ জন। রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানোর পরে ২২ জন শ্রমিকের মধ্যে ১৮ জনের হদিস মিলেছে। শুক্রবার সকালেও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা তিনজন শ্রমিককে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
চামোলি জেলার মায়াপুর-পিপলকোটি এলাকায় তেহরি হাইড্রো ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (THDC)-র জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টা নাগাদ বিপর্যয় ঘটে। নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিল হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (HCC)। আচমকাই বিপুল পরিমাণ জল, বালি, পাথর ও কাদা সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে পড়ে। সেই সময়ে শিফটে কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। মুহূর্তের মধ্যে সুড়ঙ্গের একাংশ কার্যত মরণফাঁদ হয়ে ওঠে।
দুর্ঘটনার পরে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রথম দিকে কতজন শ্রমিক ভিতরে আটকে রয়েছেন, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছিল, বহু শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। শুক্রবার সকালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্প এলাকায় দুর্ঘটনার সময় মোট ২২ জন শ্রমিক ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনের হদিস মিলেছে। তিন জন শ্রমিক এখনও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে রয়েছেন। তাঁদের নিরাপদে বের করে আনতে শুক্রবার সকালেও উদ্ধারকাজ চলছে। সুড়ঙ্গের ভিতরে জল ও ধ্বংসাবশেষ থাকায় উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্ক হয়ে এগোতে হচ্ছে।
আটকে থাকা শ্রমিকের কাছে পৌঁছতে জল সরানোর পাশাপাশি ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভিতরে পৌঁছতে অস্থায়ী ড্রাম-বোটও ব্যবহার করেছে। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে।
দুর্ঘটনার পরেই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় NDRF ও SDRF। উদ্ধার অভিযানে সেনা, ITBP, স্থানীয় পুলিশ, CISF-এর সদস্যরাও যোগ দিয়েছেন। রাতভর বিভিন্ন সংস্থা সমন্বয় করে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদেরও জীবিত অবস্থায় বের করে আনা।
চামোলির জেলাশাসক গৌরব কুমার জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলের কাছে থাকা সমস্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল কাজে লাগানো হয়েছে। সুড়ঙ্গ থেকে জল বের করে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ধাপে ধাপে ভিতরের দিকে এগোনোর চেষ্টা চলছে।
চামোলি জেলায় গত কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি চলছিল। এর আগেও নীতি উপত্যকা এলাকায় নদীর জল বেড়ে একটি সেতু ভেসে গিয়েছিল। পাহাড়ি এলাকায় লাগাতার বৃষ্টির ফলে মাটি আলগা হয়ে যাওয়াকে এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রবল বৃষ্টি ও ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের উপরের অংশে একটি গহ্বর তৈরি হয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়েই হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষ ২ কিলোমিটার দীর্ঘ টেল রেস টানেলে ঢুকে পড়ে। প্রবল জলস্রোতের ধাক্কায় অনেক শ্রমিক সুড়ঙ্গের মুখের দিকে ভেসে এলেও কয়েকজন ভিতরে আটকে পড়েন। NDRF-এর আধিকারিকরা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভিতরে বিপুল জল জমে থাকায় এবং চারদিক থেকে জল চুঁইয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজে একাধিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
তবে কী কারণে সুড়ঙ্গের ভিতরে আচমকা এত পরিমাণ জল, বালি, পাথর, কাদা ঢুকে গেল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। প্রশাসনের তরফে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জল ঢুকে পড়া ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতের কথাই সামনে এসেছে। তবে সুড়ঙ্গের কাঠামোগত কোনও সমস্যা ছিল কি না, নাকি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের জেরেই এই বিপর্যয়, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
দুর্ঘটনার পর থেকেই গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি। তিনি প্রশাসনকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বয় রেখে দ্রুত কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা প্রত্যেককে নিরাপদে বের করে আনাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমি হাসপাতালে ভর্তি আহত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল। আমি ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিসগড়ের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জানিয়েছি যে, তাঁদের এলাকার বাসিন্দারা, যারা এই ঘটনায় আহত বা জড়িত, তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্ব আমাদের।’ উদ্ধারকাজে যাতে কোনও ধরনের দেরি বা গাফিলতি না হয়, সে বিষয়েও আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার সকাল পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যেক শ্রমিককে নিরাপদে উদ্ধার না করা পর্যন্ত অভিযান থামছে না বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। এই দুর্ঘটনার পরে ২০২৩ সালের সিলকিয়ারা সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের স্মৃতিও ফিরে এসেছে, যখন ৪১ জন শ্রমিক ১৭ দিন ধরে সুড়ঙ্গে আটকে ছিলেন।