কনুইতে অ্যানাস্থেশিয়ার ইঞ্জেকশন! মাত্রাতিরিক্ত ওষুধেই মৃত্যু এনআরএসের নার্সের?
প্রতিদিন | ১৪ আগস্ট ২০২৬
ক্যানসারের মারণ যন্ত্রণা স্তিমিত করতে যে ওষুধ দেওয়া হয়, তাই প্রবেশ করানো হয়েছিল শরীরে। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে বছর ত্রিশের নার্সের মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রাথমিক সন্দেহ এটাই। বুধবার রাতে যাঁর ডিউটি ছিল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রীরোগ বিভাগে। কাজ করতে করতে আচমকা বাথরুমে যান। আর ফেরেননি। ওয়ার্ডে তখন রোগীদের ভিড়। এক জুনিয়র চিকিৎসক প্রথম খোঁজ শুরু করেন।
কোথায় গেল স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউ এর কর্মঠ নার্সিং স্টাফ? বৃহস্পতিবার হাসপাতালে গিয়ে সকলের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “ওই জুনিয়র রেসিডেন্ট প্রথম লক্ষ্য করেন ওঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাথরুমে যান। সেখানে সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না বলেই গ্রুপ ডি কর্মচারীদের ডেকে দরজা ভাঙেন। ওঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়।” এদিকে, তদন্তের স্বার্থে শুক্রবার ৪ জন নার্সকে তলব করা হয়েছে।
লাভ হয়নি তাতে। লালবাজার সূত্রে খবর মৃতের পাশে পড়ে ছিল তিনটি ভায়াল। একটি ইঞ্জেকশন। প্রতিটি ভায়াল ২ মিলিলিটারের। পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, এগুলি ফেন্টানিলের শিশি। নার্সের কনুইয়ের সংযোগস্থলে ইঞ্জেকশনের সুচের ক্ষতচিহ্নও মিলেছে। এই ফেন্টানিল কড়া ডোজের সিডেটিভ। ক্যানসারের মতো অসুখের মারণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। তবে একজন রোগীকে ২ মিলিলিটারের বেশি ওষুধ দেওয়া হয় না। এখানে মিলেছে তিন তিনটে ভায়াল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি ওষুধ।
নার্স তা কেন প্রয়োগ করলেন কনুইয়ে? নিজেই প্রয়োগ করেছেন? না কি অন্য কেউ সুচ ফুটিয়েছে? সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। লালবাজারের তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্রশ্ন আরও একগণ্ডা। নিয়মিত এই ওষুধ নার্স সেবন করতেন, না কি ভুলবশত এতটা ওষুধ নিয়েছেন তার জন্য ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করছে পুলিশ। যে ময়নাতদন্ত হচ্ছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। নার্সের স্বামীর দাবি মেনেই নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে নয়, ময়নাতদন্ত হচ্ছে অন্যত্র।
জানা গিয়েছে, বুধবার রাত ৮টায় তাঁর ডিউটি শুরু হয়েছিল। ঘটনায় রহস্যমৃত্যুর মামলা রুজু করেছে পুলিশ। ওই নার্স পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে স্বামীর পরিচয় হয়েছিল কিছু বছর আগে। সেখান থেকেই ঘনিষ্ঠতা-বিয়ে। ‘পারিবারিক অশান্তি’-কেও গুরুত্ব সহকারে দেখছে পুলিশ। মৃত নার্সকে পণের জন্য কোনও চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সাংসারিক অশান্তি ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখছে লালবাজার। তদন্তকারী অফিসাররা জানিয়েছেন, নার্সের মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। শেষ সাতদিন তাঁকে কারা কারা ফোন করেছিলেন সব দেখা হচ্ছে খতিয়ে। যে ভবনের শৌচালয় থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়েছে তার সিসিটিভি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, এই সরকার অনুমানে চলে না। বিজ্ঞানে চলে। অনুমানের কোনও অবকাশ রাখবেন না। ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে দেহ। মৃত্যুর কারণ আমার কাছে সন্দেহজনক। কেন মারা গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পুলিশ দেবে। ঘটনায় মৃত নার্সের বাবার বয়ানও ভাবাচ্ছে পুলিশকে। তাঁর বাবা জানিয়েছেন, “মেয়ের নাইট ডিউটি ছিল। সাড়ে এগারোটা নাগাদ জামাই ফোন করে বলছে মেয়ে বেঁচে নেই। আবার কিছুক্ষণ পর বলছে, আইসিইউতে রাখা রয়েছে দেহ।” পুলিশের কাছে তাঁর স্বামী স্বীকার করেছেন, “আমাকেও ফোন করেছিল সন্ধেবেলা। কিন্তু মেট্রোয় থাকার দরুন বেশিক্ষণ কথা হয়নি।”