• ‘দেশে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন’, স্বাধীনতা দিবসের আগে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের’ ডাক দিলেন সোনম ওয়াংচুক
    এই সময় | ১৪ আগস্ট ২০২৬
  • পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন। ভোট দিয়ে বিধায়ক বা সাংসদ বেছে নেওয়া। কিন্তু সরকার বা জনপ্রতিনিধির কোনও কাজে আপত্তি থাকলে? দেশের এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন চেয়ে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের’ ডাক দিলেন লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন শুক্রবার একটি ভিডিয়ো বার্তায় তিনি বলেন, ‘দেশে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। শান্তিপূর্ণ বিপ্লবই একমাত্র পথ।’

    দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানিয়েছেন, ১৯৩৬ সালের প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, প্রতিটি জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হলো, ভোটারদের নিজের কাজের হিসেব দেওয়া। ভোটাররা চাইলে যে কোনও সময়ে আইন অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করতে পারবেন। সেটা হলো ‘পাওয়ার অফ রিকল’ (Right of Recall)।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধানের বিভিন্ন সংস্করণে (যেমন ১৯৩৬ ও ১৯৭৭ সালের সংবিধানে) স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, কোনও এলাকার ভোটাররা তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাজে সন্তুষ্ট না হলে, যে কোনও সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করতে পারবেন। ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সোনম ওয়াংচুক সম্ভবত সেই ধরনের আইন পাশের কথা বলতে চেয়েছেন।

    দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি হতাশ বলে জানিয়েছেন সোনম। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় ভারতের অগ্রগতি আশানুরূপ নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘৫০ বছর আগে যে দেশগুলি আমাদের থেকে পিছিয়ে ছিল বা ভারতের সমকক্ষ ছিল, আজ তারা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে।’ মাথাপিছু জিডিপির নিরিখে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের উদাহরণ দেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৪৭-এ স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

    নিট প্রশ্নফাঁসকাণ্ডের পরে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনে বসেছিলেন সোনম। ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যন্তর মন্তরে তাঁর আন্দোলন গোটা দেশে ঝড় তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগও করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র। নতুন শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন প্রহ্লাদ যোশী। তবে প্রহ্লাদের কাজে সন্তুষ্ট নন সোনম। তাঁর কথায়, ‘নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরেও কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।’ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি না হলে দেশের ভবিষ্যতও পিছিয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

    এর পরেই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তোলেন সোনম। তবে নির্দিষ্ট কোনও দলের প্রতি তাঁর কোনও ক্ষোভ নেই জানিয়ে লাদাখের সমাজকর্মী বলেন, ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধেই অন্যায়ের প্রতিবাদে ওঠা কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগ রয়েছে।’ সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি ২০১২-১৩-র দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কথাও বলেন। তাঁর মতে, সেই আন্দোলনের জেরে দিল্লিতে সরকার বদল হয়েছিল। সোনম বলেন, ‘১২ বছর পরে দুর্নীতি পথ বদলেছে। আরও বড় আকারে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভয় দেখাচ্ছে।’

    এই পরিস্থিতিতে ভারতের একটি ‘বড় পরিবর্তন’ প্রয়োজন বলে মনে করেন সোনম। আর সেই পরিবর্তনকেই তিনি ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ওয়াংচুকের মতে, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল নেতা বেছে নেওয়ার পদ্ধতি। তিনি বলেন, ‘নেতা ভালো না হলে গোটা দেশ ভুল পথে চালিত হয়।’ তবে সৎ ও নীতিবান রাজনীতিবিদ এখনও রয়েছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ওয়াংচুক প্রশ্ন তোলেন, দেশের বহু জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে যখন ফৌজদারি মামলা রয়েছে, তখন ভারত কী ভাবে উন্নত দেশে পরিণত হবে?

    তাঁর দাবি, ভারতের প্রায় অর্ধেক সাংসদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সাংসদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে দেশের ‘সেরা মেধাবী মানুষদের’ একত্রিত করতে চান ওয়াংচুক। তাঁদের কাছ থেকে পরামর্শ ও নতুন ভাবনা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সোনমের কথায়, ‘এই মানুষগুলিই ভবিষ্যতের ভারতের জন্য একটি ‘নতুন মানচিত্র’ তৈরিতে সাহায্য করতে পারেন।’

    প্রশ্ন: সোনম ওয়াংচুক কীসের দাবি তুলেছেন?

    উত্তর: বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন তিনি। কোনও জনপ্রতিনিধির কাজ পছন্দ না হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নিয়েও ভাবনার কথা বলেছেন।

    প্রশ্ন: ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন ওয়াংচুক?

    উত্তর: রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পদ্ধতি-সহ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনকেই ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

    প্রশ্ন: ‘রাইট টু রিকল’ বা জনপ্রতিনিধিকে প্রত্যাহারের অধিকার কী?

    উত্তর: কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাজ নিয়ে ভোটাররা অসন্তুষ্ট হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে প্রত্যাহার করার ব্যবস্থাকে সাধারণ ভাবে ‘রাইট টু রিকল’ বলা হয়। ওয়াংচুকের বক্তব্যে এই ধরনের ব্যবস্থার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

    প্রশ্ন: ভারতের বর্তমান ব্যবস্থায় কি ভোটাররা যে কোনও সময় সাংসদ বা বিধায়ককে সরিয়ে দিতে পারেন?

    উত্তর: না। সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা তাঁদের প্রতিনিধি বেছে নেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনও সাংসদ বা বিধায়ককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সাধারণ ভোটারদের হাতে ‘রাইট টু রিকল’-এর মতো কোনও সাধারণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই।

    প্রশ্ন: ভারতের অগ্রগতি নিয়ে ওয়াংচুক কী বলেছেন?

    উত্তর: তাঁর দাবি, ৫০ বছর আগে যে দেশগুলি ভারতের পিছনে ছিল বা ভারতের সমকক্ষ ছিল, তাদের অনেকেই এখন এগিয়ে গিয়েছে। মাথাপিছু জিডিপির প্রসঙ্গে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়েছেন তিনি।

    প্রশ্ন: শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর আপত্তি কী?

    উত্তর: নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ওয়াংচুক বলেন, শিক্ষামন্ত্রী বদলালেও এখনও শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎও পিছিয়ে থাকবে।

    প্রশ্ন: কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কি নিশানা করেছেন ওয়াংচুক?

    উত্তর: না। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর বক্তব্য কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকারই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

    প্রশ্ন: ওয়াংচুক এরপর কী করতে চান?

    উত্তর: দেশের সৎ, নীতিবান ও নিঃস্বার্থ মানুষদের একত্রিত করে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা তৈরি করতে চান তিনি। সাধারণ মানুষের কাছেও এমন ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার আবেদন জানিয়েছেন।

  • Link to this news (এই সময়)