• হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়ায় ‘বাচ্চু’, বাঁকুড়ার দুই বন্ধুর কর্মকাণ্ডের গল্প জানেন?
    এই সময় | ১৪ আগস্ট ২০২৬
  • মনোজ কর্মকার

    সাড়ে পাঁচ মন ওজন। মাঝেমধ্যেই ঠং ঠং শব্দ করে নিজের অস্তিত্বের কথা জানায়। রকেট তৈরির ধাতুর জন্য ব্যাঙের ছাতা, সাপের খোলস আর কচ্ছপের ডিমের খোলার সঙ্গে ট্যানট্রাম বোরোপ্যাক্সিনেট মেশানোর সময়ে ঘটাং ঘটাং শব্দ করে মালিককে বারণ করে। বাংলা ভাষাও শিখেছিল সে। মঙ্গল যাত্রার সময়ে ‘ঘঙো ঘাংঙ কুঁক্ক ঘঙা আগাঁকেকেই ককুং খঙা’ বলে যান্ত্রিক সুরে গানও গেয়েছে। আবার মঙ্গলীয় সৈন্যের আক্রমণের সময়ে রুখেও দাঁড়িয়েছিল। প্রোফেসর শঙ্কুর (সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট চরিত্র) সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল ‘বিধুশেখর’ — সে এক যন্ত্রমানব।

    ‘বাচ্চু’ও অনেকটা ‘বিধুশেখর’-এর মতো ঘরের ছেলে। দোকান থেকে জিনিস কিনে আনা, বাজার করা, ওষুধ কিনে আনা — দিনভর অনেক কাজ তার। বাঁকুড়ার পাত্রসায়েরের নারায়ণপুর গ্রামে সকলের প্রিয়পাত্র সে। মালিকের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। ফরমান হলেই চার চাকার ছোট্ট যান ছুট লাগায় দোকানের দিকে। দোকানদারকে নির্দিষ্ট জিনিস দিতে বলে। দাম নিয়ে কথা হয়। পিঠের উপরেই রয়েছে ঢাকা দেওয়া বাক্স। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে পিছনের ক্যারিয়ারে বসিয়ে দিতে হবে জিনিসটি। মুখ ঘুরিয়ে বাড়ির পথে দৌড় লাগায় সেই গাড়ি।

    এই ‘কথা বলা গাড়ি’র মালিক শেখ জাহির আব্বাস আর অমিত বাগদী। একে-অন্যের বন্ধু। দু’জনে মিলে পাত্রসায়ের-এ একটি তথ্য সহায়তা কেন্দ্র চালান। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি তাঁদের দৈনিকের রুটিন। বছরখানেক আগে একটি ভিডিয়ো দেখে এই ধরনের গাড়ি বানানোর ইচ্ছা জাগে। জোগাড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। রোবোটিক গাড়ি, টকিং ডিভাইস, মিনি ক্যামেরা-সহ নানা জিনিস কিনে বানানো হয় ‘বাচ্চু’কে। ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ ধরাধামে যাত্রা শুরু করে ‘বাচ্চু’।

    আব্বাস উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ। সঙ্গী অমিতেরও পড়াশোনা ততদূর নয়। তবে ইচ্ছাশক্তি ডানা মেলার নিষেধ কোথায়? খানিকটা খেলার ছলেই শুরু হয় ‘বাচ্চু’কে তৈরির কাজ। আব্বাসের কথায়, ‘একটি ভিডিয়ো দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমরাও যদি এমন একটি গাড়ি তৈরি করতে পারি, তা হলে কাজের অনেকটা সহায়তা হবে।’ প্রায় দু-মাস ধরে চলে গবেষণা। কী কী মেশিন লাগে? কী ভাবে অ্যাসেম্বেল করা যায়, তার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়। অনলাইনেই বিভিন্ন যন্ত্র, কল-কব্জা অর্ডার দেন আব্বাস। জিনিসপত্র আসলে প্রায় ছয় মাসের চেষ্টায় গাড়িটি তৈরি হয়। আব্বাস জানান, এটি তৈরি করতে কমবেশি ২ লক্ষ টাকা মতো ব্যয় হয়েছে।

    ঠিক কী কী দিয়ে তৈরি হয়েছে এই কথাবলা গাড়িটি? লাজুক হাসি আব্বাসের। বললেন, ‘ওটা একটু সিক্রেট আছে।’ সম্প্রতি গাড়িটির বাজার করা, দোকান থেকে জিনিস আনার ভিডিয়ো ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। অনেকেই ফোনে যোগাযোগ করে এরকমই একটি গাড়ি বানিয়ে দিতে বলছেন। তবে তাতে নারাজ আব্বাস। তাঁর কথায়, ‘আমরা এটাকে নিয়ে ব্যবসা করতে চাই না। নিজেরাই ব্যবহারের জন্য এটাকে বানিয়েছি।’

    ‘বাচ্চু’কে নিয়ে বেজায় খুশি পাড়ার লোকজন। বাজারে গেলে এর সঙ্গে কথা বলা, গাড়ি থেকে জিনিস তুলে নেওয়া... মজার অন্ত নেই। স্থানীয় বাসিন্দা শেখ নজরুল বলেন, ‘ওকে যাতায়াতের পথে মাঝেমধ্যেই দেখতে পাই। ভালোই লাগে। দোকান থেকে জিনিস কিনে নিয়ে যায়। লোকজনের সঙ্গে কথাও বলতে পারে।’ ওষুধ ব্যবসায়ী পল্লব কুমার ধাড়ার কথায়, ‘আমার দোকানে আজ এসেছিল। একটা ওষুধ কিনে নিয়ে গেল। বেশ মজাদার লাগে।’

    অনলাইন ফুড-ডেলিভারি সংস্থাগুলি ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘ড্রোন’-এর ব্যবহার শুরু করেছে আমাদের দেশে। কৃষ্ণনগরের একটি রেস্তোরাঁয় গেস্ট-দের কিচেন থেকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে রোবট ‘অনন্যা’। শহরাঞ্চলে ‘রোবোটিক্স’-এর ব্যবহারের উদাহরণও নেহাত কম নয়। তবে বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ রকম যন্ত্রমানবের ব্যবহার শিখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তিকে আপন করে নিচ্ছে... পিছিয়ে নেই গ্রামও। শুধুমাত্র গল্পের পাতায় ‘বিধুশেখর’, ‘রোবু’র মতো বন্ধুকে খোঁজার দিন শেষ। গ্রামের অলি-গলি দিয়ে ঘোরা ‘বাচ্চু’রাই আজ আমাদের নিউ নরমাল।

    প্রশ্ন: ‘বাচ্চু’ কী?

    ‘বাচ্চু’ একটি কথা বলা রোবোটিক গাড়ি, যা বাঁকুড়ার পাত্রসায়েরের নারায়ণপুরে তৈরি হয়েছে।

    প্রশ্ন: ‘বাচ্চু’ কী করতে পারে?

    মালিকের নির্দেশে এটি দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতে পারে। টাকা ও পণ্য বহনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

    প্রশ্ন: ‘বাচ্চু’ কে তৈরি করেছেন?

    শেখ জাহির আব্বাস ও অমিত বাগদী মিলে ‘বাচ্চু’ তৈরি করেছেন।

    প্রশ্ন: ‘বাচ্চু’ তৈরি করতে কত খরচ হয়েছে?

    নির্মাতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে।

    প্রশ্ন: ‘বাচ্চু’ কি বিক্রি করা হবে?

    নির্মাতারা জানিয়েছেন, আপাতত ব্যবসায়িকভাবে ‘বাচ্চু’ তৈরি বা বিক্রি করার পরিকল্পনা তাঁদের নেই। নিজেদের ব্যবহারের জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)