কারুরের ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় মৃতদের নিকট আত্মীয়দের সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত খারিজ করেছিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। শুক্রবার মাদ্রাজ হাইকোর্টের সেই রায়ে স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, ‘কোনও ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্যের মৃত্যু হলে সরকার তাঁর নিকট আত্মীয়কে চাকরি দিতে পারবে না কেন?’
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ তামিলনাড়ু সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে মামলার সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলিকে নোটিসও দিয়েছে শীর্ষ আদালত। হাইকোর্টের যে রায়ে সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছিল, সেটি আপাতত কার্যকর হচ্ছে না।
কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?
শুনানির সময় PIL-কারীর আইনজীবীর উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ প্রশ্ন করে, ‘সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন করার আপনি কে?’ বিচারপতিরা জানতে চান, ‘কোনও দুর্ঘটনায় যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য মারা যান, তা হলে সেই পরিবারের ছেলে, মেয়ে বা স্ত্রী বা নিকট আত্মীয়কে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হলে আপত্তি কোথায়?’
সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, কোনও মর্মান্তিক ঘটনায় সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য করতে চায়, তা হলে শুধু অর্থ দিয়ে ক্ষতিপূরণ করার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারে। আদালত জানতে চায়, ‘সরকার যদি একটি নীতি হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে আদালত কেন তাতে হস্তক্ষেপ করবে?’
শুনানিতে তামিলনাড়ু সরকারের হয়ে সওয়াল করেন সিনিয়র আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি। তাঁর বক্তব্য, ‘সংবিধানের Article 162 অনুযায়ী রাজ্য সরকারের নিজস্ব নীতি গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে।’ কারুরের ঘটনা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
কেন চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তামিলনাড়ু সরকার?
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কারুরে তামিলাগা ভেত্রি কাজাগম (TVK)-এর একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। ওই সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া TVK সুপ্রিমো থালাপতি বিজয়। দুর্ঘটনায় ৪১ জনের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ আহত হন।
তামিলনাড়ু সরকার মৃতদের পরিবারের যোগ্য সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চলতি বছরের ১০ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয় ৩১ জন মৃতের নিকট আত্মীয়ের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। সরকারের যুক্তি ছিল, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো মানুষগুলিকে শুধু এককালীন ক্ষতিপূরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়াই এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
এই সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে PIL দায়ের হয়। গত ২৭ জুলাই মাদ্রাজ হাইকোর্ট তামিলনাড়ু সরকারের চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। হাইকোর্টের যুক্তি ছিল, সরকারি চাকরি সংবিধানের Article 14 এবং Article 16-এর সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একটি নির্দিষ্ট দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আলাদা করে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দাবি উঠতে পারে। আদালত সতর্ক করেছিল, তাতে এমন দাবির ‘floodgates’ খুলে যেতে পারে।
হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেছিল, তামিলনাড়ুতে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ প্রচলিত নিয়মে compassionate appointment-এর অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের বাদ দিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য এ ভাবে চাকরির ব্যবস্থা করা কতটা সাংবিধানিক, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল আদালত।
সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় এক রাজনৈতিক দলের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবী সরকারি চাকরির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, compassionate appointment রাজ্য সরকারের ইচ্ছাধীন হতে পারে না। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, যে রাজনৈতিক দলের সভায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সেই দলের নেতৃত্বেই এখন তামিলনাড়ু সরকার চলছে।
তখন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ তাঁকে প্রশ্ন করে, ‘আপনি কার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন?’ আইনজীবী রাজনৈতিক দলের নাম জানালে বিচারপতিরা বলেন, ‘এখানে রাজনৈতিক বিষয় আনবেন না।’
এখন সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের ফলে কারুর-কাণ্ডে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার তামিলনাড়ু সরকারের সিদ্ধান্ত আপাতত বহাল থাকছে। তবে এটি চূড়ান্ত রায় নয়। রাজ্য সরকারের আবেদন এবং চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে পরবর্তী শুনানিতেই বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।