কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে রাখা ‘শিবালিক স্তন্যপায়ী’ প্রাণীদের জীবাশ্মের সংগ্রহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জিএসআই)–র সংগ্রহ নিয়ে সংরক্ষিত এই বিপুল জীবাশ্মভাণ্ডারকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ জিওলজিক্যাল সায়েন্সেস (আইইউজিএস) মর্যাদা দিয়েছে ‘জিও কালেকশন’–এর। কিছু দিন আগে কলম্বিয়ার বোগোতায় আইইউজিএস-এর ৮২তম এগজ়িকিউটিভ কমিটি মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই প্রথম ভারতের কোনও সংগ্রহ আইইউজিএস ‘জিও কালেকশন’–এর স্বীকৃতি পেল।
‘শিবালিক স্তন্যপায়ী জীবাশ্ম সংগ্রহ’ আসলে কী?
শিবালিক পর্বতমালা হলো হিমালয়ের দক্ষিণতম প্রান্তের দীর্ঘ পার্বত্য অঞ্চল। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় এর ভূতাত্ত্বিক স্তর পাওয়া যায়। ওই স্তরগুলিতে বিশেষ করে পাওয়া গিয়েছে মায়োসিন থেকে প্লাইস্টোসিন যুগের অসংখ্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবাশ্ম। সে যুগের জীবাশ্মর এই সংগ্রহকেই ‘শিবালিক স্তন্যপায়ী জীবাশ্ম সংগ্রহ’ বলা হয়। আজ থেকে প্রায় আড়াই কোটি বছর আগে শুরু করে অন্তত ৫৩ লক্ষ বছর আগে শেষ হওয়া সময়সীমাকে ভূতত্ত্ববিদরা ‘মায়োসিন’ এবং প্রায় ২৬ লক্ষ বছর আগে শুরু হয়ে ১২ হাজার বছর আগে শেষ হওয়া সময়সীমাকে ‘প্লাইস্টোসিন’ যুগ বলে বর্ণনা করেন। কলকাতায় এই ‘শিবালিক স্তন্যপায়ী জীবাশ্ম’–র বিপুল সংগ্রহ রয়েছে।
জিএসআই জানাচ্ছে, এই সংগ্রহে ‘মায়োসিন’ ও ‘প্লাইস্টোসিন’ যুগের যাদের জীবাশ্ম রয়েছে, তারা হলো: নানা প্রজাতির বানর, বিভিন্ন ধরনের মাংসাশী প্রাণী, ইঁদুর গোত্রের প্রাণী, ঘোড়া, হাতি, গণ্ডার, জিরাফের মতো প্রাণী এবং কুমির-সহ বহু ধরনের মেরুদণ্ডী প্রাণী। ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার ও সংলগ্ন অঞ্চলে পাওয়া বেশ কিছু জীবাশ্মও এই সংগ্রহে রয়েছে। এই সংগ্রহটির একটি বড় অংশ উনিশ শতক ও বিশ শতকের গোড়ায় জিএসআই–এর প্রথম দিকের ভূতত্ত্ববিদ ও জীবাশ্মবিদেরা সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের অনুসন্ধানই ভিত তৈরি করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশে মেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবাশ্মবিদ্যার গবেষণার। পরবর্তী সময়ে বিবর্তন, স্তরবিন্যাস ও প্রাচীন পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণাতেও এই সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সংগ্রহ রাখা আছে জাদুঘরের ‘শিবালিক গ্যালারি’–তে।
আইইউজিএস–এর জিও কালেকশন প্রোগ্রাম-এর আওতায় জিএসআই-এর কলকাতার সদর দপ্তর থেকেই ভারতীয় জাদুঘরের এই সংগ্রহকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মনোনয়ন পাঠানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ফলে শিবালিক জীবাশ্ম সংগ্রহের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সংরক্ষণ, নথিভুক্তিকরণ এবং ডিজিটাল কিউরেশনের কাজেও গতি আসার ব্যাপারে জিএসআই আশাবাদী। গবেষকদের মতে, এই স্বীকৃতি শুধু একটি জীবাশ্ম সংগ্রহের মর্যাদা বৃদ্ধি নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাকৃতিক ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া–র ডিরেক্টর বর্ষা অশোক আগলাওয়ে বলেন, ‘শিবালিক অঞ্চলের এই জীবাশ্মগুলি ভূতাত্ত্বিক সময়ের দীর্ঘ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে পাওয়া প্রাণীর অবশেষের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই সময়কার জলবায়ু, পরিবেশ এবং প্রাণিবৈচিত্রের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে, বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিবর্তন ও বিস্তারের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এই নমুনাগুলির অসীম গুরুত্ব।’ তাঁর সংযোজন, ‘বহু পুরোনো গবেষণার উপাদান হিসেবে এগুলির ঐতিহাসিক মূল্যও কম নয়। তাই, কলকাতায় সংরক্ষিত এই সংগ্রহ কেবল জাদুঘরের প্রদর্শনী হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবেও অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠতে চলেছে।’