অনির্বাণ ঘোষ
রক্ত পাচারের তদন্তে কড়াকড়ি করেছে সরকার। কিন্তু তার জেরেই বিপাকে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা। যাকে ‘কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা আরও সহজ বাংলায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যকর্তাদেরই একাংশ।
ভিনরাজ্যে রক্ত ও রক্তজাত উপাদান পাচারের অভিযোগে সরকারি স্ক্যানারে ১২টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক। এর মধ্যে একটিকে আপাতত বন্ধ করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। আর ১১ বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের আউটডোর শিবির বন্ধ, যার জেরে সেখানে রক্তের মজুত ভাঁড়ার একেবারে বাড়ন্ত। ফলে সেই সব ব্লাড ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত প্রায় ৩ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগীর নিয়মিত রক্ত জোগান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বেআইনি রক্ত পাচারের অভিযোগের তদন্তে নেমে সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও, তাঁদের সন্তানদের উপরই যে ঘুরপথে তার কালো ছায়া এসে পড়বে, তা ভাবতে পারেননি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের অভিভাবকরা। সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির নথি অনুযায়ী, প্রতিটিতে প্রায় ২০০-৩০০ জন করে থ্যালাসেমিয়া রোগী নথিভুক্ত। অথচ সেখানেই আপাতত রক্তের জোগান একপ্রকার বন্ধ। এ দিকে, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের গড়ে দু’-তিন বার আরবিসি (লোহিত রক্তকণিকা)-র মতো রক্ত উপাদান নিতেই হয় প্রতি মাসে। সেখানে কোনও বিঘ্ন ঘটা মানে হিমোগ্লোবিন তলানিতে ঠেকে গিয়ে প্রাণসংশয়ের উপক্রম হওয়াও বিচিত্র নয়।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল টানাপড়েন। এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তের বাবা তথা দ্য থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার কর্তা তাপসকান্তি সেনগুপ্ত বলেন, ‘বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের বেআইনি কাজকর্ম ঠেকাতে সরকার সঠিক পদক্ষেপই করেছে। কিন্তু নজরদারি বাড়িয়ে শিবির আয়োজনের রাস্তা সরকার খুলে দিলে ভালো হয়। অন্যথায় ওই সব ব্লাড ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীরা যাবে কোথায়!’ তিনি জানান, তাঁদের সংস্থায় নথিভুক্ত প্রায় ২৩৫ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে আরবিসি জোগাতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ সদ্য অভিযুক্ত একাধিক ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে তাঁরা রক্ত নিতেন।
স্ক্যানারের বাইরে থাকা একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তারও বক্তব্য, ‘দুর্নীতি আটকাতে সরকার যে পদক্ষেপটা করেছে, তাতে ভুল নেই। কিন্তু সেই পদক্ষেপের ধাক্কা যাতে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মতো মাল্টিপল ট্রান্সফিউশনের নিয়মিত গ্রহীতাদের গায়ে না লাগে, সেটাও ভেবে দেখা উচিত ছিল।’ তিনি জানান, তাঁদের নথিভুক্ত ২৬২ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীর তালিকায় গত কয়েক দিনে অন্তত ১৫ জন নতুন রোগী যুক্ত হয়েছে, যারা আগে অভিযুক্ত কোনও না কোনও ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে আরবিসি নিতো প্রতি ১৫ দিনে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় অবশ্য সাফ জানিয়েছেন, রক্ত বা রক্ত উপাদানের কোনও সমস্যা নেই। সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি এই পরিস্থিতিতে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সাহায্যের জন্য সদা প্রস্তুত। কিন্তু রক্তদান আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী ডি আশিসের প্রশ্ন, ‘রক্ত না হয় মিললো সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে। কিন্তু সেই রক্তটা রোগীকে দেওয়া হবে কোথায়? ওই ১১টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত নেই বলে তাদের ডে-কেয়ার সেন্টারও তো বন্ধ। এখন নার্সিংহোমে বেড ভাড়া নিয়ে সেই রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করতে গেলে রোগীর পরিবারের অন্তত ৫-১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাবে প্রতিটি ট্রান্সফিউশনের জন্য।’
নতুন সমস্যার কথা শোনাচ্ছেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের অভিভাবকদের বহু পুরোনো সংগঠন, থ্যালাসেমিক গার্ডিয়ান্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তথা থ্যালাসেমিয়ার শিকার এক কিশোরের বাবা জয়ন্ত সোমও। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিচালিত থ্যালাসেমিয়া ম্যানেজম্যান্ট অ্যান্ড ডে কেয়ার সেন্টারে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের রক্ত সঞ্চালনের জন্য সরকারি-বেসরকারি, দু’ধরনের ব্লাড সেন্টার থেকেই রক্ত সরবরাহ হতো। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য যে বিশেষ ধরনের ফেনোটাইপ ম্যাচড রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন, তার পরিকাঠামো সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিতে কতটা রয়েছে, তা নিয়েও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা রয়েছে।’ ফেনোটাইপ ম্যাচিংয়ে শুধু রক্তের গ্রুপ নয়, লোহিত রক্তকণিকার বিভিন্ন বিশেষ অ্যান্টিজেনও মিলিয়ে দেখা হয় উপযুক্ত রক্ত বেছে নেওয়ার আগে।
রাজ্যে অবশ্য সামগ্রিক ভাবে রক্তের ঘাটতি নেই বলেই দাবি স্বাস্থ্য দপ্তরের। মঙ্গলবারই ৭২টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ককে ডেকে বৈঠক করে নিয়ম মেনে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহের উপর জোর দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তরফে। কিন্তু ‘রাজ্যে রক্ত আছে’ আর ‘নির্দিষ্ট থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রয়োজনের সময়ে উপযুক্ত রক্ত মিলছে’—দু’টি বিষয় এক নয় বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশও। তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কড়া পদক্ষেপ জরুরি—এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন না থাকলেও, একই সঙ্গে তদন্তের আওতায় থাকা কেন্দ্রগুলিতে নথিভুক্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য বিকল্প রক্ত-জোগানের ‘ব্যাক-আপ’ ব্যবস্থাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। (শেষ)