• কিশোর বয়সেই বিপ্লবী, ব্রিটিশের ঘুম ওড়ানো ‘ধুরন্ধর’, অজানা কাহিনি শোনালেন স্বাধীনতা সংগ্রামী গুণধর
    এই সময় | ১৬ আগস্ট ২০২৬
  • সুজয় মুখোপাধ্যায়

    সময়টা উত্তাল। ঘরে ঘরে বাজছে স্বাধীনতার রণডঙ্কা। বাচ্চা থেকে বুড়ো— ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র জপ করে চলেছেন দিন-রাত। তেমনই একটি রাতে হাওড়ার প্রত্যন্ত এলাকার একটি গলিতে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বগলে একতোড়া পোস্টার নিয়ে এক বছর দশেকের কিশোর একটার পর একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি পোস্টার সাঁটিয়ে ফের সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই গলির সামনেটা এসে পড়ল একটি জিপের জোরালো হলুদ আলো। বুটের খটখট শব্দে পাড়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার।

    এক হাবিলদার টর্চের আলোটা ফেলল সোজা ওই কিশোরের মুখে। পাশ থেকে এক ব্রিটিশ অফিসার কর্কশ শব্দে চিৎকার করলেন, ‘হে ইয়ং বয়, তুমি কে? এখানে কী করিতেছ?’ গা-হাত, পা ততক্ষণে অবশ হয়ে গিয়েছে কিশোরের। ভয়কে চেপে রেখেই ছেলেটি আলতো গলায় বলল, ‘ পোস্টার মারছি…’। ততক্ষণে ওই অফিসার এসে কিশোরের কানটা টেনে ধরেছেন। রাগে গোটা শরীর জ্বলে গিয়েছিল সেই কিশোরের। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, ‘ব্রিটিশদের ভারত ছাড়া করবই।’

    বাবা-দাদাকে প্রতিদিনই দেখেছেন স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রাণ বাজি রাখতে। দেশমাতৃকার প্রতি কর্তব্য ছেলেটি শিখে নিয়েছিল সেই ছোট থেকেই। ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির কাজ শুরু করে দেন। বিভিন্ন বিপ্লবী দলের কাছে গুপ্ত খবর পাঠানোর কাজ করে গিয়েছেন নিয়মিত। স্বাধীনতা লাভের ৮০ বছর পরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত দলিল গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময়ের কাছে তুলে ধরলেন সেই সংগ্রামী ইতিহাসের কথা।

    হাওড়ার আমতা এলাকায় আদি বাড়ি। বর্তমানে তিনি হুগলির বলাগড়ে থাকেন। গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা জয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী। জয়কৃষ্ণরা দুই ভাই। অন্যজন বিজয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজয়কৃষ্ণের বড় ছেলে ঘনশ্যাম ছিলেন গান্ধীবাদী। বাড়িতে চরকায় সুতো কাটতেন। ঘনশ্যাম ও তাঁর বন্ধুরা ‘মাতৃ পূজা’, ‘পলাশীর পরে’র মতো দেশাত্মবোধক যাত্রা ও গান করতেন।

    জেঠতুতো দাদা ঘনশ্যামের হাত ধরেই স্বদেশী আন্দোলনে পা রাখেন গুণধর। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে পাঠশালায় পড়ার সময়েই যুক্ত হন আন্দোলনের সঙ্গে। মেদিনীপুর থেকে পাঠশালায় পড়াতে আসতেন সত্য ও বিমান নামে দুই শিক্ষক। তাঁরাই ছাত্রদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁরা ২০ জন ছাত্রকে নিয়ে একটি দলও গঠন করেছিলেন।

    কিশোর বয়সেই বিপ্লবীদের হয়ে গুপ্তচর করতেন গুণধর। রাতের অন্ধকারে দোকানে ও সরকারি অফিসে লিখে পোস্টার টাঙিয়ে আসতেন। একবার সরকারি অফিসে পোস্টার লাগানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানা করে। ১০ বছর বয়সে ব্রিটিশদের হাতে কানমলাও খেতে হয়েছিল তাঁকে। হুগলি তখন বিপ্লবীদের অন্যতম আস্তানা। দাদা ঘনশ্যামের মাধ্যমেই বৃন্দাবন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার, অতুল্য ঘোষের মতো নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। একসময়ে মহাত্মা গান্ধী বাংলাদেশের নোয়াখালি যাওয়ার পথে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজের একটি সভায় গুণধর তাঁকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পান।

    স্বাধীনতার পরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন গুণধর। ১৯৬৪ সালে মহিপালপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান নির্বাচিত হন। ১৯৭০-৭১ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত একই পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলান। উপপ্রধান থাকাকালীন গ্রামের উন্নয়ন ও আলোচনার জন্য ‘গান্ধী ঘর’ তৈরি করেন। ২৪টি গ্রামের মানুষ সেখানে বসে আলোচনা করতেন। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ক্যাপ্টেন শচীন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

    জীবনে কোনওদিন ফুলপ্যান্ট পরেননি। আজও পরেন সাদা খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবি। গান্ধীজিকে দেখেই এই জীবনচর্চা শুরু। বাবার মৃত্যুর পরে গুণধরের বোনের বিয়ে হয় বলাগড়ে। তখন থেকেই তিনি চলে আসেন বলাগড়। দেশ গড়ার কাজে অবদানের জন্য অগ্রজ বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন ও শান্তিমোহন রায়ের কাছ থেকে ‘রক্তরাঙা’ একটি মেডেল পেয়েছিলেন গুণধর। সেই মেডেল আজও তাঁর কাছে সযত্নে রক্ষিত।

    এখন ৯৩ ছুঁইছুঁই। বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকেছে। মাথার চুলে পাক ধরেছে। শ্রবণশক্তিও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। চোখের চশমার পাওয়ার ভালোই। তবুও মনের শক্তি এক ফোঁটাও কমেনি। কাঁপা কাঁপা গলায় গুণধর বলেন, ‘নয় বছর বয়স থেকেই বিপ্লবীদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করতাম। শিক্ষকরা আমাদের যে ভাবে বুঝিয়ে দিতেন, আমরা সেই ভাবেই পোস্টার লাগাতাম। চারটি শব্দের হরতাল লিখে টাঙিয়ে দিয়ে আসতাম দোকানে। পোস্টার দিতে গিয়ে আমার নামে জরিমানা হয়ে গিয়েছিল।’ এত বছর পরেও সেই সব দিনের স্মৃতি আজও অমলিন।

    গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন ছেলে। ছোট ছেলে মাধব বন্দ্যোপাধ্যায় স্কুল শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সকলেই গান্ধীজির স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিলেন। বাড়ির মেয়েরাও চরকায় সুতো কাটার কাজে যুক্ত ছিলেন। বাবা যাদের কাছে পাঠশালায় পড়তেন, সেই শিক্ষকরাও ছিলেন বিপ্লবী। ছোটবেলা থেকেই বাবা গান্ধীর আদর্শ সামনে রেখে চলেন।’

    বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক তথা কলেজের অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্র অবস্থাতেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যখন দেশ স্বাধীন হয়েছিল তখন গুণধরবাবু আদর্শ গ্রাম তৈরি করেছিলেন।’

    প্রশ্ন: গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় কে?

    উত্তর: গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি কিশোর বয়সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরও তিনি সমাজ ও গ্রামোন্নয়নের কাজে সক্রিয় ছিলেন।

    প্রশ্ন: কত বছর বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়?

    উত্তর: মাত্র ১০ বছর বয়সে পাঠশালায় পড়ার সময় তিনি স্বদেশী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

    প্রশ্ন: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কীভাবে আন্দোলনে অংশ নিতেন গুণধর?

    উত্তর: রাতের অন্ধকারে দোকান ও সরকারি অফিসে ‘হরতাল’ লেখা পোস্টার লাগাতেন। পাশাপাশি বিপ্লবীদের কাছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও করতেন।

    প্রশ্ন: গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় কি ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন?

    উত্তর: হ্যাঁ। পোস্টার লাগানোর সময় ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাঁকে কানমলা খেতে হয়েছিল। একটি ঘটনায় সরকারি অফিসে পোস্টার লাগানোর জন্য তাঁকে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানাও করা হয়।

    প্রশ্ন: কোন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন গুণধর?

    উত্তর: বৃন্দাবন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার এবং অতুল্য ঘোষের মতো স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি।

    প্রশ্ন: গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় কি মহাত্মা গান্ধীকে দেখেছিলেন?

    উত্তর: হ্যাঁ। মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালি যাওয়ার পথে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজে একটি সভায় এলে গুণধর তাঁকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পান।

    প্রশ্ন: স্বাধীনতার পরে কী করতেন গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়?

    উত্তর: স্বাধীনতার পরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে মহিপালপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান হন এবং পরে ১৯৭০-৭১ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পঞ্চায়েতের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

    প্রশ্ন: গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গান্ধী ঘর’ কী?

    উত্তর: গ্রামের উন্নয়ন ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গান্ধী ঘর’ তৈরি করেছিলেন। সেখানে ২৪টি গ্রামের মানুষ একসঙ্গে বসে আলোচনা করতেন।

  • Link to this news (এই সময়)