সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: নাগরিকত্বের পরীক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। এসআইআরের আপাত-লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকার সংশোধন। কিন্তু বিহার থেকে বাংলা—শেষ বিচারে তা বদলে গিয়েছিল নাগরিকত্ব প্রমাণের এক যুদ্ধে। বাংলার লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জন্য সেই যুদ্ধ এখনও চলছে। ট্রাইবুনালে। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তো এসআইআর-ই চলছে এখনও। তারই মধ্যে এবার জনগণনার প্রশ্নপত্র প্রকাশ করে দিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। সেন্সাস বিভাগের পক্ষ থেকে জনগণনার ৪০টি প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। সেন্সাসের চিরাচরিত প্রশ্নাবলি নয়, সঙ্গে জুড়েছে একঝাঁক নতুন প্রশ্ন। তার মধ্যে সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ—নাগরিকত্ব সম্পর্কে সরাসরি অন্তত ছ’টি প্রশ্ন। জন্মস্থান, শেষতম বাসস্থানের ঠিকানা এবং সেখান থেকে অন্যত্র চলে আসার কারণ, সবটাই স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হবে। তাতেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, এই প্রশ্নাবলি কি তাহলে এনআরসির পদধ্বনি? কারণ, এসআইআর এবং সেন্সাস, দু’টি প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য পৃথক হলেও ভরকেন্দ্র একটাই—নাগরিকত্ব। মাইগ্রেশনের কারণ এবং নতুন ঠিকানায় কতদিন রয়েছেন, এমন প্রশ্ন না হলে থাকত না বলেই সন্দেহ প্রকাশ করছে বিরোধীরা। একইসঙ্গে এবার সেন্সাসে প্রশ্ন থাকছে, কোভিড ভ্যাকসিন নেওয়া আছে কি? জনগণনার এই নয়া মোড়ক রীতিমতো কৌতূহল তৈরি করছে। সঙ্গে আশঙ্কাও। প্রশ্ন উঠছে, কোভিড ভ্যাকসিনের সার্টিফিকেট না থাকলে কি এরপর সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে? পশ্চিমবঙ্গে সদ্য শুরু হলেও ভারতের অন্যত্র এখন গৃহগণনা বা হাউস লিস্টিংয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। এটাই জনগণনার প্রথম পর্ব। আর সেন্সাসের মূল পর্যায় শুরু হবে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
এই প্রশ্নেই ধাক্কার শেষ নয়। যে প্রশ্নাবলি তৈরি হয়েছে, সেখানে আধার নম্বর, ভোটার কার্ড নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট নম্বর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্যও জানতে চাওয়া হবে। এটাই বিস্ময়কর। কারণ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তথা নাগরিকত্ব প্রমাণের পরিচয়পত্র হিসাবে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্সকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যে ১১টি প্রমাণপত্র তাতে ধার্য করা হয়েছে, সেখানে এইসবের নামগন্ধ ছিল না। ছাড়পত্র ছিল শুধু পাসপোর্টের। এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টেও বহুবার চাপানউতোর হয়েছে। অথচ জনগণনায় এই প্রতিটি পরিচয়পত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, যদি থাকে তাহলে দেখাতে হবে ও নম্বর জানাতে হবে।
জনগণনার সঙ্গে এনআরসি এবং এনপিআরের পার্থক্য হল, প্রথম ক্ষেত্রে সাধারণত গণনাকারীর কাছে স্বঘোষিতভাবে তথ্য দিতে হয়। কিন্তু কোনো নথি ও প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয় না। এনআরসিতে কিন্তু নথিপত্র দেখাতে হবে। জনগণনায় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার উদ্যোগ থেকে সংশয় তৈরি হচ্ছে—এসআইআর ও সেন্সাসের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর কি এই দুই ডেটা ব্যবহার করে এনআরসি শুরু হবে? কারণ মোদি সরকারের দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য একটি স্থায়ী নাগরিকত্ব কার্ডের। প্রকৃত নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি না হলে সিটিজেনশিপ কার্ড তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই কি এনআরসির সমীকরণ স্পষ্ট হচ্ছে?
অন্যদিকে, স্বাধীন ভারতে এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাস্ট সেন্সাসও হতে চলেছে। এটা অবশ্যই বিরোধীদের চাপে মোদি সরকারের আরও একটি সিদ্ধান্ত বদলের নমুনা। রাহুল গান্ধী লাগাতার দাবি করে গিয়েছেন, কাস্ট সেন্সাস করতে হবে। প্রথমে মোদি সরকার মানতে চায়নি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বারবার যুক্তি দিয়েছেন, জাতিগণনা সমাজে বিভাজন আনবে। কিন্তু পরে সরকার রাজি হয়। সেই অনুযায়ী সেন্সাসের যে প্রশ্নপত্র প্রকাশিত হল, সেখানে দেখা যাচ্ছে—তফসিলি জাতি, উপজাতির পাশাপাশি আরও একটি কলাম। কাস্ট উল্লেখের। ১৮৭১ সালে ভারতে যখন প্রথম ব্রিটিশ শাসক জনগণনা প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তখনই পরিকল্পনা ছিল কাস্ট সেন্সাসের। ১৮৮১ সালেও চেষ্টা হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে কাস্ট সেন্সাস সম্ভব হয়েছিল ১৯৩১ সালে। তারপর থেকে আর কোনো কাস্ট সেন্সাস হয়নি ভারতে। মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট ও সংরক্ষণ তৈরি হয়েছিল ১৯৩১ সালের কাস্ট সেন্সাসে প্রাপ্ত জাতিগত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। ৯৫ বছরে অনগ্রসর জনসংখ্যা বিপুল বেড়েছে। তাহলে কি সংরক্ষণ কাঠামোর রদবদলও আসন্ন?