রামনগরে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের পূর্ণাবয়ব মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দিরের বেহাল দশা
বর্তমান | ১৬ আগস্ট ২০২৬
সৌমিত্র দাস, কাঁথি: রামনগরের মৈতনা পঞ্চায়েতের ভুঁইয়াজিবাড় এলাকায় ‘দেশপ্রাণ’ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের পূর্ণাবয়ব মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দিরের বেহাল দশা। স্মৃতিমন্দিরের চারদিক বাগানের জন্য গোলাকার ঘেরা জায়গা থাকলেও বাগান বলতে কিছু নেই। সেখানে আগাছা ভরে গিয়েছে। অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূর্তিটিও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। মলিন চেহারা হয়ে গিয়েছে। বাংলার ‘মুকুটহীন সম্রাট’ দেশপ্রাণের মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দিরের এহেন বেহাল দশায় ক্ষুব্ধ অনেকে। তাঁরা অবিলম্বে নতুন সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রামনগরের কানুপয়ড়্যা হাটের অদূরে পুকুরপাড়ে দেশপ্রাণের স্মৃতিমন্দিরটি রয়েছে। স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে অবিভক্ত মেদিনীপুরের নানা জায়গায় পদার্পণ করতেন দেশপ্রাণ। ভুঁইয়াজিবাড় গ্রামেও গিয়েছিলেন তিনি। দেশপ্রাণের অন্যতম অনুগামী ছিলেন রামনগরের স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমর পরিষদের সর্বাধিনায়ক বলাইলাল দাসমহাপাত্র। তাঁরই ব্যবস্থাপনায় দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ট্রাস্ট কমিটি গড়ে ওঠে। কমিটির উদ্যোগেই এই পূর্ণাবয়ব মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দিরটি তৈরি হয়। দেশপ্রাণের মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দির গড়ার পিছনে বলাইবাবুই মুখ্য ভূমিকা নেন।
১৯৪৯সালের ১১ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাজ্যপাল প্রয়াত কৈলাসনাথ কাটজু মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই স্মৃতিমন্দিরটি স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দেশপ্রাণের স্মৃতির অন্যতম ধারক। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিমন্দিরটি বেহাল দশা হয়। এই পরিস্থিতিতে ২০১০সাল নাগাদ তৎকালীন সময়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের উদ্যোগে স্মৃতিমঞ্চটি নতুনভাবে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। স্মৃতিমন্দিরের চারদিকে অংশ ভেঙে কাঠামোটির কলেবর আরও ছোট করা হয়। ২০১১সালের ১১আগস্ট নবকলেবরে তৈরি স্মৃতিমঞ্চের উদ্বোধন করেন কাঁথির প্রাক্তন সাংসদ শিশির অধিকারী। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফের স্মৃতিমন্দিরটি বেহাল দশা হয়েছে।
সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেল, চারদিকে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে যে বেড়া দেওয়া ছিল, তার কাঁটাতার উধাও হয়ে গিয়েছে। লোহার গ্রিলগেট থাকলেও সেটি সবসময় খোলা থাকে। গোরু-ছাগল ঢুকে পড়ে। স্মৃতিমন্দিরে ওঠার মুখে আর একটি গেট রয়েছে। ভিতরে খোলা জায়গায় যে যখন পারেন, নানা জিনিসপত্র রাখেন। এর আগে স্মৃতিমন্দিরের চারদিকে বিভিন্ন ফুলের বাগান ছিল। কিন্তু সেখানে এখন কোনো বাগান নেই। এলাকার শিশুরা যখন-তখন ঢুকে খেলত। চারদিকে আগাছার জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। শিশুরা এখন আর আসে না। মঞ্চের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। মূর্তিটিতেও ধরেছে ফাটল। ধুলোয় ঢেকে গিয়েছে। পাশেই রয়েছে অশোকস্তম্ভ। তাতেও মলিনতার ছাপ পড়েছে। শুধু তাই নয়, আলোর ব্যবস্থাও ঠিকঠাক নেই। পাশেই একটি গৃহস্থবাড়ি থেকে তার কোনোরকমে ঝুলিয়ে একটি বাল্ব লাগানো হয়েছে। আলোও ঠিকমতো জ্বলে না। সব মিলিয়ে স্মৃতিমন্দিরটির বেহাল দশা। প্রতিবছর দেশপ্রাণের জন্মদিবস ও প্রয়াণ দিবসে মূর্তিতে মালা পড়ে। ব্যস, ওই পর্যন্তই।
শিক্ষক ও লেখক নন্দগোপাল পাত্র বলেন, দেশ তথা রাজ্যের স্বাধীনতা আন্দোলনে বীরেন্দ্রনাথের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর মূর্তি সহ স্মৃতিমন্দির এভাবে রয়েছে দেখে খারাপ লাগে। এই স্মৃতিমন্দিরের চারদিকে বাগান সাজিয়ে একটি পার্ক হিসেবে গড়ে তুললে ভাল হত। একইসঙ্গে দেশপ্রাণের অবদান সম্পর্কে বিবরণসমৃদ্ধ ফলক বা ডিসপ্লে বসালে নতুন প্রজন্ম অনেককিছু জানতে পারত। পাশাপাশি রাতে সেখানে আলোর স্থায়ী ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। রামনগরের বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল বলেন, আমি বিষয়টি জানি। দ্রুত আশু সংস্কারের ব্যবস্থা নেব। দেশপ্রাণের স্মৃতিমন্দিরটির সংরক্ষণের জন্য বিধায়ক হিসাবে যেটুকু করার, নিশ্চয়ই করব।