বড়লাট বিদায় নিচ্ছে, দেখতে বনগাঁ থেকে কলকাতা দৌড়লেন কেনারাম
বর্তমান | ১৬ আগস্ট ২০২৬
কুন্তল পাল, বনগাঁ: ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট মধ্যরাতে ভারত স্বাধীন হওয়ার খবর পৌঁছে গিয়েছিল বনগাঁর চালতেপোতা গ্রামেও। তখন কেনারাম ঘোষ কুড়ি বছরের যুবক। শুনলেন ভোরবেলা রাজভবন ছাড়বেন বড়লাট (শেষ ব্রিটিশ গভর্নর)। আনন্দের চোটে আর তর সইনি কেনারামের। ১৫ আগষ্টই বন্ধুদের সঙ্গে পৌঁছে যান কলকাতা। রাজভবনের সামনে পৌঁছে হতবাক। থিকথিক করছে ভিড়। সে ভিড়ে সেঁধিয়ে গেলেন কেনারামরা। আমরা স্বাধীন কথাটা চিত্ত তোলপাড় করে দিয়েছিল যুবকগুলির।
চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম গভর্নর হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের কারণে রাজভবনের গেট সাময়িক বন্ধ। কেনারামরা ভিড়ে মিশে সদ্য স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চিত হচ্ছেন। এই একশো বছর বয়সেও সে দিনটি ম্লান হয়নি। এখনও চোখ বন্ধ করলে সিনেমার মতো দেখতে পান।
এখন শতায়ু পেরিয়ে বৃদ্ধ হয়েছেন কেনারাম ঘোষ। বনগাঁ চালতেপোতা গ্রামের বাসিন্দা। ১৯২৬ সালে ( বাংলা ১৩৩৩) জন্ম। কৃষক পরিবারের সন্তান। নিজেও চাষবাস করতেন। অল্প বয়সে বিয়ে হয়। তাঁর চার পুত্র ও দুই কন্যা। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শাসন, আর তার অনাচার নিজের চোখে দেখেছেন। তারপর দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দ চূড়ান্তভাবে উপভোগও করেছেন। এখন কানে একটু কম শোনেন। তবে স্মৃতি টনটনে। খালি চোখেই বইপত্র, খবরের কাগজ পড়েন। নিজের হাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখালেখি করেন। সরকারি কোনো অনুদান নিতে অনীহা। শতায়ু পার করেও বার্ধক্যভাতার আবেদন করেননি। বলেন, ‘আমার সামর্থ্য আছে। ছেলেরা রোজগেরে। ওসব আমার দরকার নেই। যাঁদের প্রয়োজন তাঁরা নেবেন।’ কেনারাম ঘোষের স্মৃতি নিজেই পরাধীন ও স্বাধীন ভারতের একটা ইতিহাস লিখে ফেলতে পারে। বলেন, ‘লোকের মুখে শুনেছিলাম রাজভবনে নেহেরু ও গান্ধীজি আছেন। বড়লাট বিদায় নেবেন। নিজের চোখে দেখতে দুই বন্ধুকে নিয়ে এখান থেকে রাজভবন গেলাম। তবে নেহেরু কিংবা গান্ধীজিকে দেখতে পাইনি। তাঁরা ছিলেন কি না জানিওনা।’ ১৯৪৭ সালে ১৫ আগষ্ট ভারত স্বাধীন হলেও বনগাঁ মহকুমা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে থাকবে নাকি ভারতের অংশ হবে তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সে কারণে অনেকে বনগাঁ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। তবে নিজের ভিটে ছাড়েননি কেনারাম। থেকে যান। কারণ তাঁকে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, বনগাঁ যদি পাকিস্তানে থাকে গোরুগুলির দড়ি খুলে ছেড়ে দিবি। ভিটে মাটি ছেড়ে জিরাট চলে যাবি। তবে দু’দিন পর বনগাঁকে ভারতের অংশ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। তাই বনগাঁ আর ছাড়তে হয়নি কেনারামকে। মানুষটি স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে একদিন শুনলাম খুলনা থেকে গান্ধীজি ফিরছেন। ছুটে গিয়েছিলাম বনগাঁ স্টেশনে। দুর থেকে গান্ধীজিকে ট্রেনে করে যেতে দেখেছিলাম। চোখ বন্ধ করলে এখনও যেন সে ছবি দেখতে পাই। ট্রেনের হুইসলের শব্দ কানে আসে...’-নিজস্ব চিত্র