শুভাশিস সৈয়দ
জটিল অসুখে আক্রান্ত কিশোর। দিনরাত পুকুরে ডুবে বসে থাকতেন তিনি। জলে ভিজে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এমন ঘটনার ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে সম্প্রতি। তা দেখেই এক বহুজাতিক সংস্থা যোগাযোগ করে পরিবারের সঙ্গে। তাদের ব্যবস্থাতেই শেষ পর্যন্ত মুম্বই পাড়ি দিচ্ছেন মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার একেবারে সাধারণ পরিবারের কিশোর ইকবাল হোসেন। এ দিন চিকিৎসা করাতে যাওয়ার সময়ে আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইকবাল।
পরিবার জানিয়েছে, এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে মুম্বইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে জটিল রোগে আক্রান্ত বেলডাঙার ইকবাল হোসেনকে। শনিবার সকালে অ্যাম্বুল্যান্সে করে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার বড়ুয়া ফরাজিপাড়ার বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইকবালের সঙ্গে মুম্বইতে যাচ্ছেন ইকবালের মা কামিরন বিবি। কামিরনের এক জামাই অপু শেখ। পরিবারটির সঙ্গে যাচ্ছেন রানিনগর থানার ইসলামপুরের বাসিন্দা রুবেল শেখ। পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক রুবেল জানান, তিনি কেরালাতে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। যে কোনও প্রয়োজনে কারও পাশে তিনি থাকেন বলেই জানাচ্ছেন পরিচিতরা। কেরালা থেকে ফিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইকবালের অসুস্থতার খবর জানতে পারেন তিনি। ফোন নম্বর জোগাড় করে তিনি কামিরন বিবিকে সাহায্য করার কথা জানান। ইকবালের মা তাতে সম্মতি জানান।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ইকবালকে নিয়ে যাওয়া থেকে থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করবে একটি বহুজাতিক সংস্থা। ইকবালের মা কামিরণ বিবি জানান বলেন, ‘কয়েক দিন আগে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে পাঠায় ওই সংস্থাটি। তিনি ফিরে গিয়ে রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরে বৃহস্পতিবার ফের ওই সংস্থার কর্তারা এসেছিলেন। তাঁরা এ দিন সকালে ইকবালকে চিকিৎসার জন্য মুম্বই নিয়ে যাওয়ার কথা জানান এবং আমাদের প্রস্তুতি নিতে বলেন।’
এ দিন একটি অ্যাম্বুল্যান্স ও একটি গাড়ি এসে ইকবালদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। অ্যাম্বুল্যান্সে ইকবাল ও তাঁর মা ওঠেন। অন্য গাড়িটিতে বাকি দুই জন চেপে সরাসরি কলকাতা এয়ারপোর্টে পৌঁছন। সেখান থেকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে মুম্বইয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ইকবালকে। সেখানে তাঁর মা এবং চিকিৎসক থাকবেন। আর অন্য একটা বিমানে ইকবালের সঙ্গী বাকি দুইজনকে নিয়ে যাওয়া হবে। মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে ইকবালকে সরাসরি নিয়ে গিয়ে বেসরকারি এক হাসপাতালে ভর্তি করানো হবে।
সারাদিন পুকুরের জলেই থাকতেন ইকবাল। তাঁর সারা শরীর জ্বালা করে, তা থেকে রেহাই পেতেই বেছে নিয়েছিলেন পুকুরের জল। পরিবার জানাচ্ছে, রাতেও পুকুরের জলে ভেসে ঘুমিয়ে কাটাতেন তিনি। পুকুরের জলে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুড়ে দিতেন মুড়ি-বিস্কুট-কেক। জলে দাঁড়িয়েই সে সব মুখে চালান করে দিতেন তিনি।
১২০ কিলো ওজনের তরুণ ইকবালকে নিয়ে দিশেহারা গোটা এলাকা। এ ভাবে পুকুরের জলে ভেসে থাকতে দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। টানা জলে পড়ে থাকায় তাঁর হাত-পায়ের চামড়া সাদা হয়ে গিয়েছে। সারা শরীরে এগজ়িমা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও পুকুরে দিনের পর দিন ডুবে থাকার ফলে সর্দি-কাশিতেও আক্রান্ত ইকবাল। স্থানীয় বাসিন্দা কবীর আলি প্রথম তাঁর জলে ডুবে থাকার ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন, সেটা ভাইরাল হয়ে যায়। কবীরের পাশাপাশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় মুস্তাক আহমেদ।
যাঁদের জন্য ইকবালকে গোটা ভারত চিনলো, সেই কবীর ও মুস্তাকের গলায় অবশ্য অভিমানের সুর। তাঁরা বলছেন, ‘কিউআর কোড লাগিয়ে সমাজ মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করা হয়েছিল। মুম্বই যাওয়ার আগে একটি বারের জন্য ওই পরিবার একবার যোগাযোগ পর্যন্ত করেনি।’