• পার্টি অফিস থেকে উদ্ধার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ, মিলল সুইসাইড নোটও
    এই সময় | ১৬ আগস্ট ২০২৬
  • Big Breaking: বীরভূমের রামপুরহাটে তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক তথা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার সকালে রামপুরহাট শহরে নিজের বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পাশ থেকে মিলল সুইসাইড নোট। তাতে লেখা-‘কোনও দিনই কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। সারাজীবন এক পয়সা কোনও কাজের বিনিময়ে নিইনি।’ রাজনীতিতে আসাটা ভুল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন রামপুরহাটের পাঁচবারের তৃণমূল বিধায়ক। স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে কার্যালয়ের জানলা দিয়ে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে জানা গিয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে।

    রামপুরহাটের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় থাকতেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক। সেই বাড়ির লাগোয়া কার্যালয় থেকেই এ দিন সকালে উদ্ধার হয়েছে তাঁর দেহ। তবে ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হলো, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মৃত্যুর আগের দিন, শনিবারও বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা-কর্মীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। এমনকী রাতেও অন্যান্য দিনের মতো পরিবারের সকলের সঙ্গে ডিনারও সারেন। এ দিন সকালে তাঁর দেহ দেখে হতভম্ব সকলে।

    ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট আসনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজয়ের পরে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন বলেও খবর। সম্প্রতি দুর্নীতিতে নাম জড়ানোয় বিব্রত ছিলেন এলাকায় মাস্টারমশাই বলে পরিচিত এই প্রবীণ নেতা। সেই প্রসঙ্গই সুইসাইড নোটে উল্লেখ করেছেন তিনি। সুইসাইড নোটে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন— ‘ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। রাজনৈতিক বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে, তবে কখনও শত্রুতার রূপ নেয়নি। সর্বদা সব দলীয় অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সারাজীবন এক পয়সা কোনও কাজের বিনিময়ে নিইনি।’

    এখানেই শেষ নয়, চিঠির ছত্রে ছত্রে নিঃকলঙ্ক ইমেজে কলঙ্কের কালি লাগার হতাশা এবং ক্ষোভ। নোটে লেখা, ‘DRDA-তে জেনারেল কমিটি মিটিং ডাকা ছাড়া আমার আর কোনও দায়িত্ব ছিল না। আমি টেন্ডার কমিটিতেও ছিলাম না। ইস্যু করা প্ল্যান পাস করা বা নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দেওয়ার বিষয়েও আমি ছিলাম না। আমাকে মেলাইন করার জন্য যা করা হলো তার জন্য আমি ধিক্কার জানাচ্ছি। আজ তাই মনে হচ্ছে রাজনীতিতে আসাটাই খুব ভুল হয়েছে। আমার বংশের ছেলেদের রাজনীতি না করার পরামর্শ দিচ্ছি ওরা ওদের নিজেদের কাজের মধ্যেই থাকে।’ তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাই একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ভাবে জানা যাবে।

    অধ্যাপনা থেকে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরভূমের রামপুরহাটে জন্ম নেওয়া এই প্রবীণ নেতা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। স্নাতক, স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে রামপুরহাট কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে পূর্ণ সময়ের রাজনীতিতে চলে আসেন তিনি।

    আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল হাত শিবিরের সঙ্গে। বীরভূমে কংগ্রেসের পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনবার নির্বাচনে লড়েছিলেন। তবে প্রথম দিকে সাফল্য আসেনি। এর পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার রামপুরহাট থেকে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হন তিনি। রাজ্যে তখনও বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন চলছে। সেই পরিস্থিতিতে রামপুরহাট আসন ধরে রাখা তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

    ২০০৬ সালে রাজ্যজুড়ে বামেদের প্রবল প্রভাবের মধ্যেও রামপুরহাট থেকে ফের জয় পান আশিস। এর পরে ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১—পরপর তিন নির্বাচনেও একই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। অর্থাৎ টানা পাঁচবার রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন তিনি।

    ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় এলেও প্রথম দফায় মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ২০১৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন তিনি। আয়ুর্বেদ, যোগ, ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথি দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

    পরবর্তী সময়ে বায়োটেকনোলজি, স্ট্যাটিস্টিক্স ও প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশন-সহ একাধিক দফতরের দায়িত্ব সামলান। ২০১৭ সালে তাঁকে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত রাজ্যের কৃষি দপ্তর তাঁর হাতেই ছিল।

    ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের রামপুরহাট থেকে জয়ী হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২ জুলাই ২০২১ তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন তিনি।

    ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি বীরভূমে তৃণমূলের অন্যতম প্রবীণ সংগঠক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। দলীয় রাজনীতিতে তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। তবে রাজ্যে পালাবদলের পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গেলেও তাঁকে বিদ্রোহী তৃণমূলের বৈঠকে অংশ নিয়ে দেখা গিয়েছিল।

    আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে বীরভূমে তৃণমূলের সাংগঠনিক সঙ্কটের সময়ে। জেলা তৃণমূলের দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডল জেলে যাওয়ার পর জেলার সংগঠন সামলাতে যে কোর কমিটি তৈরি হয়েছিল, তাতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন আশিস।

    তবে বীরভূমের তৃণমূল রাজনীতিতে তাঁর সঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের সম্পর্ক সবসময়ে মসৃণ ছিল না। ২০২২ সালের বগটুই-কাণ্ডের পর সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। অনুব্রত অভিযোগ করেছিলেন, গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল নেতা আনরুল হোসেনকে দলে রাখার ক্ষেত্রে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল। আশিসের বক্তব্য ছিল, ওই সিদ্ধান্ত কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, সম্মিলিত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।

    তবুও দলের অন্দরে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে দীর্ঘদিন অপেক্ষাকৃত শান্ত, সংযত এবং প্রবীণ নেতা হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর অধ্যাপক পরিচয়ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।

    ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দীর্ঘ নির্বাচনী সাফল্যে ছেদ পড়ে। রামপুরহাট আসনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন তিনি। পাঁচবারের বিধায়ক এবং প্রাক্তন মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকারের এই পরাজয় ঠিক মন থেকে মানতে পারেননি। নির্বাচনের পরে তৃণমূলের বীরভূম জেলা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেও সরে দাঁড়ান আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।

  • Link to this news (এই সময়)