• ‘ভব্য’ স্কিমে ফিরছে হারানো গৌরব! আসানসোলের বন্ধ ঢাকেশ্বরী কটন মিল ঘিরে নতুন আশার আলো
    প্রতিদিন | ১৬ আগস্ট ২০২৬
  • দীর্ঘ কয়েক দশকের নীরবতা ভাঙতে চলেছে আসানসোলের ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী কটন মিল। একসময়ের সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে ফের কর্মসংস্থানের নতুন আশায় বুক বাঁধছেন কুলটি ও আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভার ১৮টি গ্রামের মানুষ। কেন্দ্রের ‘ভারত অড্যোগিক বিকাশ যোজনা’ বা ‘ভব্য’ (ব্হআব্য়আ) স্কিমকে অনুঘটক করে এই বন্ধ কারখানার পরিত্যক্ত জমিতে বিশ্বমানের এমএসএমই শিল্প পার্ক গড়ার প্রক্রিয়ায় নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। আর তা হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা।

    ​১৯৫২ সালে দামোদরের তীরে অবিভক্ত বঙ্গের খ্যাতনামা শিল্পপতি সূর্য বোসের হাত ধরে ৩৫০ একর জমির ওপর যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকেশ্বরী কটন মিল। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে সূচিত হওয়া এই কারখানা। খুব অল্পদিনের মধ্যেই খ্যাতি পায় সংস্থা। একসময়ের বিশ্বখ্যাত ঢাকাই মসলিন বোনা হতো এখানে। সূর্য বোসের নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ হয় সূর্যনগর। তবে ১৯৬৩ সালে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানায় স্থায়ীভাবে তালা ঝোলে। পরবর্তীতে আশির দশক পর্যন্ত শ্রমিকরা বেতন পেলেও রাজনৈতিক উদাসীনতা ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই মিলটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আর সেই সুযোগে ওই এলাকায় সমাজবিরোধীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সমাজবিরোধীদের তাণ্ডবে এলাকার বহু মূল্যবান মেশিনারি থেকে শুরু করে লোহা, এমনকী কারখানার দেওয়ালের ইট পর্যন্ত লুঠ হয়ে যায়। 

    দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ক্ষোভ ও আক্ষেপ মেটাতে উদ্যোগী হয়েছে বর্তমান শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। রাজ্য সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর থেকে মিলের প্রায় ১৪৮.৬১ একর দায়ভারমুক্ত জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ পরিকাঠামোয় উন্নত সড়ক ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত জল সরবরাহ সুনিশ্চিত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পার্ক গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। পরিত্যক্ত এই শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মন্ত্রীরা। রাজ্যের পূর্ত ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী তথা কুলটির বিধায়ক ড: অজয় পোদ্দার জানান, এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও থমকে থাকা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে এই বিশাল পরিত্যক্ত জমিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি এবং রাজ্য সরকার সে বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী তথা আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট আশ্বস্ত করে বলেন, “তোলাবাজি বা সিন্ডিকেট রাজ বরদাস্ত করা হবে না। অব্যাবহৃত জমির সঠিক ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবং স্বচ্ছ পরিবেশে শিল্পের পরিবেশ তৈরি করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”

    প্রশাসনের এই পদক্ষেপে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন এলাকার বাসিন্দারাও। স্থানীয় বাসিন্দা মৃদুল সরকার বলেন, “বছরের পর বছর ধরে চোখের সামনে কারখানাটিকে ধ্বংস হতে দেখেছি, তাই নতুন করে শিল্প গড়ার খবরে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী।” অপর এক বাসিন্দা হেমন্ত মাজি জানান, এই শিল্প পার্ক তৈরি হলে আশপাশের ১৮টি গ্রামের অসংখ্য বেকার যুবক নিজ এলাকায় কাজ পাবেন। আরেক বাসিন্দা কৌশিক মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, “শুধু কথা নয়, দ্রুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে কাজ শুরু করা হলে এলাকার স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি আবার প্রাণ ফিরে পাবে।” সব মিলিয়ে, কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ প্রশাসনিক সদিচ্ছায় আসানসোলের বুকে সূর্যনগরের ঢাকেশ্বরী মিল আবার তার পুরনো ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরে পাবে বলেই আশাবাদী শিল্পাঞ্চলবাসী।
  • Link to this news (প্রতিদিন)