• দীর্ঘ বন্দিজীবনের শেষে জঙ্গলে ফেরা, গোরুমারায় নতুন করে ঘর বাঁধল ভোলা-বাসন্তী
    এই সময় | ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • অর্ঘ্য বিশ্বাস

    জঙ্গলই ছিল ওদের ঘরবাড়ি। শাল-সেগুনের ছায়া মাড়িয়ে, কাদামাটির গন্ধ মেখে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে ওরা। কিন্তু আচমকা সব বদলে যায়। জঙ্গলের বদলে ঠিকানা হয় বিহারের গোপালগঞ্জের এক আশ্রম। সেখানেই কেটে যায় দীর্ঘ বন্দিজীবন। অবশেষে মিলল স্বাধীনতা।

    ভোলা আর বাসন্তী। একজনের বয়স ৬৮, আর এক জনের ৫৭। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তবু ছোট ছোট চোখে জঙ্গলে ফেরার উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। এখন ওদের স্থায়ী ঠিকানা জলপাইগুড়ির গোরুমারা জঙ্গলের দক্ষিণ ধুপঝোড়ার পিলখানা। সবুজ প্রকৃতির বুকে পা রাখতেই তাদের সে কী বৃংহন! যেন দ্বিতীয় বার ঘরে ফেরার আনন্দে আত্মহারা দু’টি কুনকি হাতি।

    প্রায় আড়াই মাস ধরে গোরুমারার পরিবেশের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে তারা। নতুন ঠিকানা, নতুন সঙ্গী, নতুন বন—তবে সব কিছুই যেন ওদের বড় আপন। মাঝে মধ্যে গোরুমারার কুনকি হাতিদের সঙ্গে জঙ্গলও ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। যেন দীর্ঘ বন্দিজীবনের পরে চেটেপুটে নেওয়া স্বাধীনতার স্বাদ।

    বয়স বড় বালাই। সেই কথা মাথায় রেখেই ভোলা আর বাসন্তীকে নিয়ে সাবধানে পা ফেলছে বন দপ্তর। গোরুমারার অন্য কুনকি হাতিদের মতো ওদের দিয়ে ভারী কাজ করানো হচ্ছে না একদমই। জঙ্গল টহল কিংবা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো ভারী কাজ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে দু’জনকে। শেষ বয়সে দায়িত্বের বোঝা নয়, বরং জুটেছে যত্ন আর নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

    ভোলা আর বাসন্তীর নতুন জীবনের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ এক গল্প। বিহারের গোপালগঞ্জের ওই আশ্রমে এক সময় ছিল তিনটি কুনকি হাতি। বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু হাতিগুলির মালিকানা কিংবা সেখানে রাখার প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল না বলেই অভিযোগ। বিষয়টি নজরে আসতেই সরব হয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শুরু হয় আইনি লড়াই।

    আদালতের নির্দেশে আশ্রম থেকে তিনটি হাতিকে উদ্ধার করে বিহার বন দপ্তর। শেষ পর্যন্ত তাদের তুলে দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ বন দপ্তরের হাতে। কিন্তু নতুন জীবনের পথ মসৃণ ছিল না মোটেই। আশ্রমে থাকাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তৃতীয় কুনকি হাতিটি। মৃত্যু হয় তার। জীবন যুদ্ধে শুধু টিকে থাকে ভোলা আর বাসন্তী।

    উদ্ধারের পর প্রথমে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যানচুয়ারিতে। সেখানে প্রায় দু’মাস ধরে চলে যত্নআত্তি। তার পরে গত জুনে তাদের নতুন ঠিকানা হয় গোরুমারার ধুপঝোড়া পিলখানা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেখানেই নতুন করে ঘর বাঁধল তারা।

    ভোলা আর বাসন্তী নতুন বাড়িতে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে বলে জানালেন গোরুমারা বন্যপ্রাণী বিভাগের এডিএফও রাজীব দে। তাঁর কথায়, ‘অভিজ্ঞ মাহুত আর বনকর্মীরা তাদের দেখভাল করছেন। পাশাপাশি রয়েছে অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকের নিয়মিত নজরদারি।’

    তবে শরীরে থাবা বসিয়েছে বয়স। সেই বিষয়টা মাথায় রেখেছেন উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণী বিভাগের মুখ্য বনপাল ভাস্কর জেভি। তিনি বলেন, ‘গোরুমারার অন্য কুনকি হাতিদের তুলনায় ভোলা আর বাসন্তীর বয়স সবচেয়ে বেশি। তাই বিশেষ যত্ন নেওয়া হচ্ছে।’

    গোরুমারায় দু’টি হাতির চারপাশে এখন বেড়ে উঠছে নবীন কুনকিরা। হয়তো কোনও এক সকালে গোরুমারার ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দুলকি চালে হাঁটবে ভোলা। পাশে শুঁড় দোলাতে দোলাতে যাবে বাসন্তী। দূরে খেলবে কচি কুনকিরা। তাদের দিকে স্নেহ ভরা চোখে তাকিয়ে থাকবে ওরা। সেই চোখে লেগে থাকবে জঙ্গল চেনার বহু বছরের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার দীর্ঘশ্বাস, আর শেষ বয়সে ফিরে পাওয়া এক টুকরো নিশ্চিন্ত জীবন।

  • Link to this news (এই সময়)