• অধ্যাপক থেকে পাঁচ বারের বিধায়ক, রামপুরহাটের বদলের নেপথ্যে ‘স্যর’ আশিস
    এই সময় | ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • ঋতভাষ চট্টোপাধ্যায়

    রামপুরহাটের অলিগলি তাঁকে ‘স্যর’ বলে চেনে। পাঁচ বারের বিধায়ক। তাঁর কাছে এলাকার সমস্যা নিয়ে যে কোনও সময়ে ছুটে যাওয়া যেত। কিন্তু রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাঁর ‘স্যর’ পরিচয়টা পুরোপুরি মুছে যায়নি। রবিবার সকালে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে রামপুরহাট জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই সব টুকরো স্মৃতি।

    এ দিন ভোরে রামপুরহাটে বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পাওয়া যায় একটি সুইসাইড নোটও। রামপুরহাট কেন্দ্রে ২০০১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত টানা পাঁচ বারের বিধায়ক তিনি। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। সামলেছেন ডেপুটি স্পিকারের পদও। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন। রাজ্যে পালাবদলের পরে সেই ভাবে আর সক্রিয় রাজনীতিতে আর দেখা যায়নি তাঁকে।

    আশিস ছিলেন বরাবরের মেধাবী ছাত্র। রামপুরহাট হাই স্কুল থেকে রামপুরহাট কলেজ। তার পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সম্ভাবনার বীজ দেখেছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এই সময়েই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। এক সময়ে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্বও সামলেছেন। সেই ছাত্র রাজনীতিই ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় বৃহত্তর রাজনীতির মঞ্চে।

    তবে শিক্ষকতায় ছেদ পড়েনি। রামপুরহাট কলেজেই অধ্যাপনা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবেও নিজের ছাপ রেখেছেন। ছাত্রদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর। রামপুরহাট গার্লস হাই স্কুল এবং রামপুরহাট কলেজের সভাপতিও হয়েছেন। রামপুরহাট কলেজে তাঁর উদ্যোগেই চালু হয়েছিল ডিগ্রি কোর্স।

    রাজনীতিতে পথ চলার শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। রামপুরহাট পুরসভার প্রাক্তন উপপুরপ্রধান সুকান্ত সরকার ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ। তাঁর কথায়, ‘২০০০ সালের আগে দু’বার কংগ্রেসের হয়ে বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন আশিস। কিন্তু দু’বারই পরাজিত হন।’ তার পরে রাজনৈতিক জীবনে আসে বড় মোড়। তৃণমূল প্রার্থী হয়ে ২০০১-এ প্রথম বার বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। সেই শুরু। তার পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

    তাঁর রাজনৈতিক সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামপুরহাট। এটা শুধু বিধানসভা কেন্দ্র নয়, তাঁর ঘরবাড়ি। সুকান্ত সরকারের কথায়, ‘রামপুরহাটবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির সমাধান করাই ছিল স্যরের প্রধান লক্ষ্য।’ রামপুরহাট কলেজের ডিগ্রি কোর্স চালু করা থেকে শুরু করে রামপুরহাট স্টেশনের পরিকাঠামোর উন্নয়ন—একাধিক কাজের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দাবি জানিয়ে রামপুরহাট স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতায়নের কাজ তিনি করিয়ে নিয়েছিলেন বলে দাবি আশিস ঘনিষ্ঠদের।

    শুধু শিক্ষা কিংবা রেল নয়, তাঁর হাত ধরেই স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও বড় পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে রামপুরহাট। এক সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামপুরহাটবাসীকে বাইরে যেতে হত। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, মহকুমা হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজে উন্নীত করা হোক। উদ্যোগী হয়েছিলেন আশিস। ২০১৯-এ আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হয় রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের।

    একটা শহর শুধু হাসপাতাল বা কলেজ দিয়ে বদলায় না। বদলায় তার যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তা, সেতু, যাতায়াতের পরিকাঠামোয়। রামপুরহাটের সেই বদলের গল্পেও আশিসের ভূমিকার কথা মনে করেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সুবিধার জন্য সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে রামপুরহাট বাইপাস—একাধিক পরিকাঠামোগত প্রকল্পে তাঁর উদ্যোগের কথা জানিয়ে সুকান্ত বলেন, ‘বাইপাস তৈরির পিছনেও আশিসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এমনকী রামপুরহাট সফরে এসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাইপাস দেখে আশিসের প্রশংসা করেছিলেন।’

    ছাত্র রাজনীতি দিয়ে পথচলা। তার পর শিক্ষকতা। নির্বাচনী রাজনীতিতে পর পর পাঁচ বার জয়। মন্ত্রিত্ব। বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পরিচয়ের তালিকাটা দীর্ঘ হয়েছে। কিন্তু রামপুরহাটের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘স্যর’। রবিবার রাতে তারাপীঠ মহাশ্মশানের ইলেকট্রিক চুল্লিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো তাঁর। প্রিয় ‘স্যর’-কে শেষ বারের জন্য বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিলেন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ। এই ইলেকট্রিক চুল্লিটাও তৈরি হয়েছিল তাঁর উদ্যোগেই।

  • Link to this news (এই সময়)