রাকিব ইকবাল, উলুবেড়িয়া
বাজারে যা সাধারণের নাগালের ধরাছোঁয়ার একবারে বাইরে, সেই ইলিশ এখন শয়ে শয়ে মিলছে নদীর পাড়ে। সব মরা। ফুলে-ফেঁপে ঢোল। ইলিশের এমন করুণ পরিণতির ছবি কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে মৎস্যজীবীদের। হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে গত দু'দিন যাবৎ প্রচুর সংখ্যায় মরা ইলিশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য শুধু পশ্চিম পাড়েই নয়, পূর্ব পাড়েও এই ছবি। তালিকায় শুধু যে ইলিশ রয়েছে, এমনটা নয়। ভোলা, বিভিন্ন প্রজাতির ট্যাংরা, চিংড়ি, চেঙোও রয়েছে মাছের মড়কের তালিকায়।
রবিবার থেকে হাওড়া গ্রামীণের হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে কাঁজিয়াখালি, রাঙামাটি, কালীনগর, জগদীশপুর বাঁশতলা, কলসাপা চেঙ্গাইল-সহ নদী তীরবর্তী এলাকায় মাছের মড়কের ছবি দেখা যায়। তবে মড়ক লাগা মাছের মধ্যে ইলিশের সংখ্যাই বেশি। খোকা ইলিশ থেকে শুরু করে এক কেজি ওজনের মাছও নদীর পাড়ে থরে থরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। হঠাৎ করে নদীতে এ হেন মাছের মড়কে চিন্তিত হুগলি নদী পাড়ের মৎস্যজীবীরা।
বর্ষার সময়ে এই ইলিশ তাঁদের বাড়তি দুটো পয়সা এনে দেয়। হুগলি নদী তীরবর্তী ফুলেশ্বর, বাউড়িয়া, কাজিয়াখালির মৎস্যজীবীদের দাবি, নদীর জল দূষণের কারণেই নদীতে মাছের মড়ক লেগেছে। মৎস্যজীবীদের কথায়, এর আগেও তাঁরা বর্ষার সময়ে নদীতে এমন মাছের মড়ক দেখেছেন। তবে এবারে ইলিশের মড়ক বেশি। কাঁজিয়াখালি এলাকার মৎস্যজীবী অষ্ট পাত্রের দাবি, 'নদীর জল দূষণের কারণে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এ ভাবে চলতে থাকলে আমরা মৎস্যজীবীরা না খেতে পেয়ে মরব।'
স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ ভাণ্ডারী বলেন, 'সকালে নদীতে স্নান করতে এসে দেখি, নদীতে প্রচুর মাছ মরে ভাসছে। প্রতি বছর নদীতে এই সমস্যা দেখা দেয়।' তাঁর দাবি, কলকারখানার দূষিত জল খালের মাধ্যমে নদীতে মিশে নদীর জল দূষিত করছে। ২০২০ সালের মার্চ মাস নাগাদ হুগলি নদীতে এই ভাবে মাছের মড়ক দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ে উলুবেড়িয়া এক নম্বর ব্লকের মৎস্য দপ্তর ও উলুবেড়িয়া পুরসভার স্বাস্থ্য আধিকারিকরা জলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এর পরে ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ মানকুর, বাকসি হাট এলাকায় রূপনারায়ণে মাছের মড়ক লাগার ঘটনা ঘটে। সে বারও নদীর জল দূষণকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন পরিবেশকর্মীরা।
পরিবেশকর্মী চিত্রক প্রামাণিক বলেন, 'হুগলি নদী জলজ জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। শুধু মাছই নয়, এখানেই প্রচুর পরিমাণে দেখা মেলে গাঙ্গেয় শুশুক, গ্যাঞ্জেটিক টার্টেলের। এ ছাড়াও মেলে ইলিশ। মেলে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ। এহেন জলজ প্রাণীর ভাণ্ডারে ভরপুর হুগলি নদীতে মাছের মৃত্যু নিয়ে শঙ্কিত পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের অনুমান, কারখানার দূষিত জল বা বর্জ্য মিশে নদীর জল দূষিত হয়ে মাছের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এক মৎস্য আধিকারিক বলেন, 'কারখানার দূষিত জল বেশি পরিমাণে মিশে থাকলে, মাছের মড়ক লাগার আশঙ্কা থাকে। কারখানার দূষিত বর্জ্য নদীতে মিশলে, এখানকার গাঙ্গেয় শুশুক ও ইলিশ মাছে প্রভাব পড়বে। অনেক সময়ে জলের তাপমাত্রা ও জলে লবণাক্ততার তারতম্যের জন্য ইলিশের মতো সংবেদনশীল মাছ মারা যেতে পারে।' চিত্রক বলেন, 'নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে দূষণ রোধ করতে হবে। কারণ, নদীই আমাদের লাইফ লাইন।'