• বিধায়ক হওয়ার পরেও বিনামূল্যে নিয়মিত পাঠদান, প্রিয় স্যরের মৃত্যুতে স্মৃতিমেদুর রামপুরহাট
    এই সময় | ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • ঋতভাষ চট্টোপাধ্যায়

    এক সময়ে রামপুরহাট কলেজে বাংলা পড়িয়েছেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশ-বিদেশে নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের অনেকেকেই বিনামূল্যে পড়িয়েছেন তিনি। বিধায়ক হওয়ার পরেও সেই নিয়মে কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। সেই ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি দিয়েছেন জীবনের পাঠ। শিখিয়েছিলেন জীবনে বেঁচে থাকার মানে। সেই প্রিয় ‘মাস্টারমশাই’ যে নিজেই এই ভাবে জীবন শেষ করে দেবেন তা ভাবতেই পারেননি তাঁরা।

    ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার

    রবিবার সকালেই রামপুরহাটের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় বাড়ি লাগোয়া তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার হয়েছে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ। ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বার বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আমলে কৃষি ছাড়াও একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে জেতার পরে হয়েছিলেন বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার। রাজনীতে পুরোপুরি আসার আগে রামপুরহাট কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। আর, বিধায়ক হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন বিনামূল্যে পাঠদান করেছেন তিনি। ‘সুইসাইড নোটে’-ও এই কথা উল্লেখ করেছেন রামপুরহাট কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।

    ছাত্রীদের সমস্ত বিষয়ে পারদর্শীর পরামর্শ

    বিধায়ক হিসেবে নয়, একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে রামপুরহাটের একাধিক স্কুলের পরিচালনা সমিতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। রামপুরহাট গার্লস হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সম্পাদক এবং পরে সভাপতিও হয়েছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন রামপুরহাট গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষিকা রুমেলা দাশগুপ্ত। এই শিক্ষিকা বলেন, ‘তিনি ছিলেন অভিভাবক এবং শিক্ষানুরাগী। সকল ব্যস্ততার মাঝেও উনি আমাদের সময় দিতেন। দীর্ঘদিন তাঁকে কাছে থেকে দেখে প্রতিটা মুহূর্তে সমৃদ্ধ হয়েছি। একজন রাজনৈতিক নেতা যে এ রকম হতে পারেন তা হয়তো আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে না দেখলে জানতেই পারতাম না।’

    স্কুলের পঠনপাঠনের উন্নতিই শুধু নয়, সমস্ত বিষয়ে ছাত্রীদের কী ভাবে পারদর্শী করা যায় তা নিয়েও শিক্ষিকাদের নিয়মিত উপদেশ এবং পরামর্শ দিতেন তিনি। এমনকী স্কুলের যে কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত থাকতেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।

    বিনামূল্য পাঠদান

    তাঁকে দেখে একই রকম অবাক হয়েছিলেন রুমেলার স্বামী অভিষেক দাসও। তিনি বলেন,‘ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দরজা খোলা থাকতো । ২০১৩ সাল নাগাদ আমি একটি প্রয়োজনে যখন প্রথম তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম । তখন সত্যি বলতে একটু অবাকই হয়েছিলাম । দেখেছিলাম প্রচুর ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি বাড়ির ছাদে পড়াচ্ছেন । তিনি কিছুক্ষণের জন্য নীচে গিয়েছিলেন। তখন ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে বলে জানতে পারি, তিনি নিয়মিত বিনামূল্যেই ছাত্রছাত্রীদের এই পাঠ দান করেন।’

    বিশ্বাস করতে কষ্ট

    একই কথা তাঁর প্রাক্তন ছাত্রী সুস্মিতা রায়চৌধুরী, মিতুল চট্টোপাধ্যায়দের। তাঁরা বলেন, ‘রাজনীতির বাইরেও স্যরে নিজস্ব পরিচয় আছে। সব থেকে বড় কথা তাঁকে আমরা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। নিজেরাই দেখেছিলন অনেক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে মাইনে না নিয়েও পড়াতেন তিনি। ওই ছাত্র-ছাত্রীদের কোনও রকম সমস্যা হলে সবার আগে তিনিই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। এমন এক ব্যক্তিত্বকে হারানো সত্যিই বেদনাদায়ক। স্য়র যে এমন কাজ করতে পারেন তা বিশ্বাসই করতে পারছি না।’

    সকলের আপনজন

    রামপুরহাটের বাসিন্দারা জানিয়েছেন,বিধায়ক থেকে মন্ত্রী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার হওয়া সত্বেও মাটির মানুষই ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। সহজ মনেই সকলের সঙ্গেই মিশতেন তিনি। ছিলেন সকলের আপনজন। সেই তিনিই যে আত্মঘাতী হবেন তা মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা।

  • Link to this news (এই সময়)