• মিড ডে মিলে বাচ্চারা কি পোলাও-মাংস বা পৌষের পিঠেও পাবে? খোঁজ নিল এই সময় অনলাইন
    এই সময় | ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • থালায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খিচুড়ি, ব্যাট পাঁপড়, আর সেদ্ধ ডিম। বৃষ্টির দিনে এ রকম মিড ডে মিল পেয়ে সকলের মুখেই তখন তৃপ্তির হাসি। কেউ কেউ তো দেখা মাত্রই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। একটুখানি খিচুড়ি মুখে দিয়েই পাঁপড়ে মোলায়েম কামড়। পরের গ্রাসে একটু ডিমও ভেঙে খেল কেউ কেউ। তার মধ্যেই চলে এল আরও একটা জিনিস — গজা! দিদিমণিরা পাতে তিনটে করে গজা দিতেই বিস্ময়ের আর অন্ত ছিল না ওদের চোখে-মুখে। একজন তো আহ্লাদ করে বলেই ফেলল, ‘গজা-আ-আ-আ! কত দিন খাইনি, দিদিমণি!’



    এটাই ছিল দিন দশেক আগে পূর্ব কলকাতার একটি স্কুলে মিড ডে মিলের বিরতির ছবি। কথায় কথায় স্কুলের এক শিক্ষিকা জানালেন, সে দিন খিচুড়ি, গজা খাওয়ার পরে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী প্রশ্ন করেছিল, ‘আগের বারের মতো এ বারও গুড়পিঠে, পিঠেপুলি হবে তো?’

    মিড ডে মিলে মাথাপিছু যা বরাদ্দ, তার সঙ্গে খরচের হিসেব কখনওই মেলে না — এত দিনে এ কথা সর্বজনবিদিত। তা সত্ত্বেও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে পড়ুয়াদের জন্য মাঝেসাঝে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন। বিভিন্ন পুজো-পার্বণে পোলাও-মাংস, কখনও আবার মকর সংক্রান্তির আগে খুদেদের পাতে পড়েছে নলেন গুড়ের পায়েস আর গুড়পিঠে। বিভিন্ন ফল মেশানো সুস্বাদু চাল মাখা খেতে খেতে বাচ্চারা শিক্ষকদের কাছে গল্পের ছলে বাংলার নবান্ন পার্বণের কথা শুনেছে।



    ইসকনও কি ধারা অব্যাহত রাখবে? প্রতিষ্ঠানের কলকাতা-নিউ টাউন শাখার জনসংযোগ আধিকারিক অনন্ত ভগবান দাস এই সময় অনলাইনকে জানান, পূর্বনির্ধারিত খাবারের বাইরেও অনেক খাবার দেওয়া হয় বাচ্চাদের। কখনও ফল, কখনও মিষ্টি। বাংলার বিভিন্ন মরশুমের বিশেষ বিশেষ খাবারও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। অনন্ত বলেন, ‘পুজো-পার্বণ মাথায় রেখেও আমরা খাওয়াব। আর আমরা যা-ই খাওয়াব, সেটা ভালোই হবে। কেউ নিরাশ হবে না। তবে একই সঙ্গে প্রোটিনের বিষয়টাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। নির্ধারিত মাপকাঠি মেনে, পুষ্টিবিদদের সঙ্গে কথা বলেই আমরা খাবার দেব। এত দিন তো মিড ডে মিলে বরাদ্দ খুবই কম ছিল। সম্প্রতি তা বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া অনেক শিল্পপতি-উদ্যোগপতি অনুদান দেন। ফলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’

    তবে স্কুলশিক্ষা দপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্যে এমনিতেই কেন্দ্রের তিথি ভোজন প্রকল্প চালু রয়েছে। এই প্রকল্পে পুণ্যতিথি উপলক্ষে বা অঞ্চলভিত্তিক পার্বণ অনুযায়ী মিড ডে মিলের রোজকার খাবারের বাইরে ভিন্ন স্বাদের পুষ্টিকর খাবার শিশুদের মুখে তুলে দেওয়া হয়। বিয়ে, জন্মদিন এবং রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বিভিন্ন ধর্মীয় বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের দিনে এই ভোজ খাওয়ানো হয় স্কুলে স্কুলে। এই কর্মসূচির আওতাতেই পোলাও-মাংস বা পৌষের পিঠে খাওয়ানো হয়।



    পিএম পোষণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত স্কুলশিক্ষা দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, ‘গত ২ বছর ধরে এ রাজ্যে তিথি ভোজন কর্মসূচি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। বছর দুয়েক আগে আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে সুন্দরবনের ১১ হাজার শিশুকে তিথি ভোজন করিয়েছিলাম। একটি ব্যাঙ্কের অনুদানের অর্থেই তা সম্ভব হয়েছিল। এ বছর থেকে তিথি ভোজনকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে শিশুরা নানা স্বাদের খাবার পাবে।’ পাশাপাশি ইসকনের কাজ নিয়েও স্কুলশিক্ষা দপ্তর যে সন্তুষ্ট, সে কথাও জানান ওই আধিকারিক। বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত যা খবর পেয়েছি, তাতে ইসকনের খাবার বাচ্চাদের খুবই ভালো লাগছে। আমরা এটাই চাই।’

    রাজ্যে পালাবদলের পরে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা পুর এলাকার স্কুলের মিড ডে মিল দেবে ইসকন। তার পরেই শুরু হয় বিতর্ক। কেন কলকাতা এলাকার পড়ুয়ারা নিরামিষ খাবে, কেন তারা নির্দিষ্ট ডিম পাবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরে গত ১ অগস্ট থেকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতায় মিড ডে মিল দেওয়া শুরু করে ইসকন। তার আগেই অবশ্য ডিম বিতর্কের অবসান হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, ইসকনের খাবারের পাশাপাশি সপ্তাহে দু’দিন পড়ুয়াদের ডিম দেওয়া হবে।

    গত ১ অগস্ট ইসকনের অন্নামৃত প্রকল্পের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ৭ অগস্ট পর্যন্ত পড়ুয়াদের পাতে ডিম বা অন্য কোনও আমিষ পদ পড়েনি। তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হতেই সরকারি তরফে সিদ্ধান্ত হয়, হরিণঘাটা ফার্ম থেকে ডিম কেনা হবে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তা সেদ্ধ করে স্কুলে স্কুলে পাঠাবে। পরে সব স্কুলে গ্যাসের সংযোগ, ইনডাকশন হিটার-সহ পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরি হলে ডিম সিদ্ধ করার ভার দেওয়া হবে স্কুল কর্তৃপক্ষকেই। সেখানে রাঁধুনি এবং সহায়িকারা ডিম সিদ্ধ করবেন। যত দিন না সেই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে, তত দিন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিই ডিম দেবে।

    পাশাপাশি ইসকনও নিজেদের মতো করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে কলকাতার বিভিন্ন স্কুলে। ইসকনের তরফে অনন্ত বলেন, ‘প্রকল্পের উদ্বোধনের দিন কলকাতা শহরের অন্তত ৫০০ স্কুলের ৪৪ হাজার পড়ুয়াকে খাবার দেওয়া হয়। এখন সংখ্যাটা বেড়েছে। এখন প্রায় ৫০ হাজার পড়ুয়া ইসকনের খাবার পায়। সংখ্যাটা আড়াই লাখে পৌঁছবে আগামী কয়েক মাসে।’ একেবারে শুরুর দিকে কোনও কোনও স্কুলে খাবার পৌঁছয়নি বা পর্যাপ্ত খাবার পাঠানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। তা নিয়ে অনন্ত বলেন, ‘কিছু জায়গায় সরু গলির কারণে খাবারের গাড়ি পৌঁছতে পারেনি। এখন সেই সমস্যা মিটে গিয়েছে। যেখানে সরু গলি, আমরা টোটো করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছি।’

    ইসকনের হাতে মিড ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। আমিষ বনাম নিরামিষ বিতর্কের সূত্র ধরে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সরকারি বিদ্যালয়ের পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীলতা কি কাম্য? তাঁদের মত ছিল, সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে খাদ্যের ধরন নির্ধারিত হওয়া উচিত শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজন, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক পরামর্শের ভিত্তিতে — ধর্মীয় বিশ্বাস বা খাদ্যনীতির ভিত্তিতে নয়।

    পাল্টা অভিমতও ছিল। অনেকেরই বক্তব্য, মিড ডে মিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য কখনও নির্দিষ্ট কোনও খাদ্যাভ্যাস প্রতিষ্ঠা করা ছিল না। ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল শিশুদের অপুষ্টি কমানো, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, স্কুলছুট কমানো এবং এক সঙ্গে বসে খাওয়ার মাধ্যমে সামাজিক সমতা গড়ে তোলা। অর্থাৎ প্রকল্পের সাফল্যের বিচার হবে খাবারের পুষ্টিগুণ, গুণমান এবং নিয়মিত সরবরাহ দিয়ে। আমিষ না নিরামিষ, তা দিয়ে নয়।

    তা ছাড়া ইসকন এই প্রকল্পে নতুনও নয়। গত প্রায় ২৫ বছর ধরে তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলপড়ুয়াদের জন্য রান্না-করা খাবার সরবরাহ করছে। বর্তমানে একাধিক রাজ্য-কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ শিশুর কাছে খাবার পৌঁছে দেয় তারা। এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য তাদের আধুনিক কেন্দ্রীয় রান্নাঘর, পুষ্টিবিদদের পরামর্শ এবং অঞ্চলভিত্তিক খাদ্যতালিকা তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সর্বত্র একই খাবার দেওয়া হয় — এমন ধারণা সঠিক নয়। উত্তর ভারতে যেখানে রুটি-তরকারি বা রাজমা-চালের মতো খাবার থাকে, সেখানে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী ডাল-ভাত, খিচুড়ি বা আনাজভিত্তিক খাবারই প্রাধান্য পায়।

    সরকারি নির্দেশিকায় প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালরি ও প্রোটিনের মান ঠিক করে দেওয়া রয়েছে। তার ভিত্তিতে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ডিম না থাকলে শিশুদের পর্যাপ্ত প্রোটিন মিলবে না। যদিও পুষ্টিবিদদের একাংশের মতে, ডাল, ভাত, ডালজাতীয় শস্য এবং আনাজপাতির সঠিক সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের বড় অংশই সরবরাহ করা সম্ভব। এর পিছনে রয়েছে পুষ্টিবিজ্ঞানের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা — প্রোটিনের পরিপূরক কার্যকারিতা। ডালে লাইসিন পর্যাপ্ত থাকলেও মেথিয়োনিন তুলনামূলক কম। আবার ভাতে মেথিয়োনিন বেশি, কিন্তু লাইসিন কম। তাই ডাল ও ভাত এক সঙ্গে খেলে ঘাটতি পূরণ সম্ভব। খিচুড়িও একই কারণে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এর সঙ্গে আনাজপাতি, ডাল বা অন্যান্য উপাদান যুক্ত হলে শুধু প্রোটিন নয়, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের চাহিদাও অনেকটাই পূরণ করা যায়। অতএব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত অন্য জায়গায়। খাবার সুস্বাদু কি না, বাচ্চাদের খেতে ভালো লাগছে কি না, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে তার মিল রয়েছে কি না, শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি মিলছে কি না, রান্না ও পরিবেশন স্বাস্থ্যসম্মত হচ্ছে কি না — এই সব প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ।

    এখনও পর্যন্ত ইসকনের মিড ডে মিলে সন্তুষ্ট কলকাতার স্কুলগুলি। ইস্ট পয়েন্ট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছন্দা ঘোষ বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত যা দেখলাম, ইসকনের খাবার ভীষণ ভালো। বাচ্চারা চেটেপুটে খাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ওরা পনির, সয়াবিন, ছানা, কুমড়ো, সবজি, ডাল আর পাঁপড় দিয়েছে। ডালে অনেক কিছুই থাকে। কড়াইশুঁটি, গাজর, ফুলকপি। পাঁপড়টা বাচ্চারা খুব ভালো খায়। মাঝে এক দিন ঘুগনিও দিয়েছে। খাবারের পরিমাণও ঠিকঠাক। আগে অনেক সময়ে খাবার কম পড়ে যেত। কিন্তু এখন তো খাবার বেঁচেও যায়।’



    একই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন গার্ডেনরিচ নুটবিহারী দাস গার্লস হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষিকা রেশমি বসু চৌধুরী। তাঁর কথায়, ‘ইসকনের খাবার ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আগের মতো ও রকম ট্যালট্যালে ঝোল থাকে না। পর্যাপ্ত খাবার থাকে।’ প্রধানশিক্ষিকা সংযোজন করেন, ‘ইসকন সমস্ত কিছুতে ভীষণ তৎপর। শুরুতে একদিন খাবার কম পড়েছিল। ফলে আমাদের আবার খাবার আনাতে হয়। এই খবর পাওয়ার পরে ওরা নিজেরাই ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল। যা খরচ হয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন পেমেন্ট-এর মাধ্যমে মিটিয়ে দিয়েছে। আমি তো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া স্বাধীনতা দিবসের জন্য শুকনো খাবার দেওয়ার কথা ছিল। সেটাও এক দিন আগে দিয়ে গিয়েছে, যাতে দেরি না হয়।’

  • Link to this news (এই সময়)