তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬ জন। এখনও অবধি আট জনের পরিচয় জানা গিয়েছে। যার মধ্যে ৩ জন আলিপুরদুয়ারের। মৃতদের নাম কমল রায়, অমিত পাল ও সুবীর সাহা। এ ছাড়া মেঘালয়ের পাঁচ জন রয়েছেন মৃতের তালিকায়। ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে ঘটনাস্থল দেখিয়েছেন দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। এক্সে সমবেদনা জানিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সোমবার ভোরের এই ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সব থেকে বড় অভিযোগ, এত বড় হোটেল আগুনের দখলে চলে গেল, অথচ কোনও ঘরে কোথাও ফায়ার অ্যালার্মই বাজেনি। এখানেই শেষ নয়, আগুন লেগেছে বুঝতে পেরে যখন পড়ি কী মরি করে হোটেলের আবাসিকরা ছুটছেন, ফায়ার এগজ়িট গেটে তখনও ঝুলছে তালা! অভিযোগ, হোটেল ধোঁয়ায় ঢেকে গেলেও গেটটি বন্ধ থাকায় বেরোতে পারেননি সেখানে থাকা পুণ্যার্থীরা।
হোটেলের মালিকের ছেলে কল্যাণ পাল যদিও এ দিন সংবাদমাধ্যমে দাবি করেন, ‘হোটেলের পেছনের দিকে Emergency Exit এবং সিঁড়ি থাকলেও অনেক পর্যটকই তা জানতেন না। ফলে অনেকেই সামনের দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গিয়েছেন।’
সকাল গড়াতেই দুর্গাপুর থেকে ফরেন্সিক টিম এসেছে ঘটনাস্থলে। নমুনা সংগ্রহ করেছে তারা। পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভুন্দেশ জানিয়েছেন, ২২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আটক করা হয়েছে হোটেলের মালিকের ছেলেকে। তদন্তে ৯ সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। মৃতদের পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা।
PMO এক্স হ্যান্ডলে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আমি মর্মাহত। যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা জানাই। আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, এই কামনা করি। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের স্থানীয় প্রশাসন সহায়তা করছে।’
শ্রাবণের শেষ সোমবার আজ। তার আগে শনিবার, রবিবার উপচে পড়া ভিড় হয়েছে তারাপীঠে। ভক্তের ঢল। সমস্ত হোটেলই ফুল। তারাপীঠ থানা ও তারাপীঠ মন্দির থেকে একেবারেই সামনে অবস্থিত হোটেল ‘বিদেশিনী’। সেখানেই এ দিন ভোরে আগুন লাগে। শর্ট সার্কিটের জেরেই এই আগুন বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে।
কিন্তু সেই আগুন যে এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে, ভাবতেই পারেননি হোটেলে আসা অতিথিরা। প্রথমে একতলায় রিসেপশনে আগুন লাগে বলে খবর। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারতলাতেও। ঘরে ঘরে তখন অতিথিরা ঘুমোচ্ছেন। পরিস্থিতি একটাই ভয়াবহ হয়, বাঁচতে কেউ জানলার কাচ ভেঙে পাশের পুকুরে ঝাঁপ মারেন, কেউ আবার কার্নিশে নেমে পথ খোঁজেন, কোথায় গেলে প্রাণে বাঁচবেন। কেউ আবার গাছ বেয়ে নামতে চেষ্টা করেন নীচে।
স্ত্রী, দুই সন্তানকে নিয়ে ওই হোটেলে থাকাই এক ব্যক্তি হোটেল রুমের বাথরুমে আশ্রয় নেন। চালিয়ে দেন শাওয়ার। পাছে ওই জলের কাছে হার মানে মানুষ খেকো ভয়াবহতা। অভিযোগ, হোটেলে ফাইবারের ফলস সিলিং থাকায় হু হু করে আগুন ছড়াতে থাকে। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক। ঘর, সিঁড়ি, বারান্দা কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন বাবা। দু’টি দেহ উদ্ধার হয়েছে, সন্তান কোলে জড়ানো অবস্থায় রয়েছেন বাবা।
এ দিনের ঘটনায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘তারাপীঠে আকস্মিক ও মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে আমি শোকস্তব্ধ। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। যাঁরা আপনজন হারিয়ে নিঃস্ব, তাঁদের এই দুঃসহ শোক সহ্য করার শক্তি ঈশ্বর প্রদান করুন। একইসঙ্গে, যাঁরা আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত ও পরিপূর্ণ সুস্থতা প্রার্থনা করছি।’ তারাপীঠের হোটেল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।