নিজস্ব প্রতিনিধি কৃষ্ণনগর: রাতেই ঘর ছাড়তে হবে। কারণ, সেখানে বার্ষিক ‘মেইনটেন্যান্সে’র কাজ হবে। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন রাতে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে সার্কিট হাউস ছড়ার ‘নির্দেশ’ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। বাইরে তখন বিজেপির নেতা কর্মীদের বিক্ষোভ। চলছে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। যদিও তিনি শেষপর্যন্ত ঘর ছাড়েননি। পরেরদিন কৃষ্ণনগরেই পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতা দিবস পালন করেছেন। শুক্রবার হোগলবাড়িয়া থানাতে হাজিরা দিতে এসে কার্যত ‘রাত দখল’ করলেন তিনি। দেশের একজন মহিলা সাংসদকে রাতে এভাবে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশের মতো বেনজির ঘটনায় তোলপাড় গোটা দেশ। অভিষেক বন্দোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব থেকে শুরু করে একযোগে সরব হয়েছে বিরোধী শিবির। সাংসদ নিজেও চিঠি লিখেছেন লোকসভার স্পিকারকে। তাতে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি।
অভিষেক বন্দোপাধ্যায় নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘মঞ্চে নারী শক্তির উদযাপন করছেন।আর যে মহিলা আপনাদের চ্যালেঞ্জ করছেন, তাঁকে ভয় দেখাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। এটা করা যায় না।’কালীগঞ্জের বিধায়ক তথা কালীঘাটপন্থী রাজ্য মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী আলিফা আহমেদ বলেন, ‘মাঝরাতে একজন নির্বাচিত মহিলা সাংসদকে যদি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে হয়, তাহলে বাংলার আইনশৃঙ্খলা কোথায়? বাইরে দুষ্কৃতীরা জড়ো হয়ে ভয় দেখাবে, আর প্রশাসন নীরব থাকবে—এটা কোনওভাবেই গণতন্ত্র হতে পারে না।’ যদিও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সাংসদ যে সার্কিট হাউসে রাতে থাকবেন তা প্রশাসন কিংবা পুলিশ জানত না।’
আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে হোগলবাড়িয়া থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় শুক্রবার মহুয়া মৈত্রকে হাজিরার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেইমতো স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন দুপুরে থানায় হাজিরা দিয়ে, সন্ধ্যায় কৃষ্ণনগরে সার্কিট হাউসে তাঁর নির্ধারিত রুমেই আসেন তিনি। প্রথমদিকে পরিস্থিতি ঠিক ছিল। সাংসদকে চা ও রাতের খাবারও দেওয়া হয়। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে রাত সাড়ে ন’টার পর থেকে।
সাংসদ ভিডিও বার্তায় জানান, ৯টা ৪৭ মিনিটে নদীয়া জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক তাঁকে সার্কিট হাউস ছাড়তে বলেন। কারণ, এটা নাকি উপরমহলের নির্দেশ। ১০টা ৫২ মিনিটে মহুয়া মৈত্র হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি নির্দেশ পান, যেখানে তাঁকে রুম খালি করতে বলা হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়, বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য সার্কিট হাউস আগামী ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পরিষেবার জন্য বন্ধ থাকবে। তবে, ১৩ আগস্টের আগের সমস্ত বুকিং এই আদেশের বাইরে থাকবে।
লোকসভার স্পিকারের কাছে সাংসদ চিঠি লিখে প্রশ্ন করেন, ‘আমি যখন বুকিং করেছিলাম এবং সার্কিট হাউসে ঢুকেছিলাম, তখনও আমাকে কিছু জানানো হয়নি। কোনো অর্ডার থাকলে তা প্রশাসন রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমাকে চলে যেতে বলল কেন? রাত ১০টা ৫২ মিনিটে সেই নির্দেশ পাঠাল কেন?’ এভাবে ওইদিন রাতে দফায় দফায় ভিডিও বার্তায় প্রশাসন ও সরকারের উপর ক্ষোভ উগরে দেন সাংসদ।
সাংসদের অভিযোগ, এই নির্দেশ পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই বিজেপি কর্মী সমর্থকরা সার্কিট হাউসের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সার্কিট হাউসের ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের বাংলো। পাশেই এসপি অফিস। এইরকম একহাই প্রোফাইল জায়গায় মহিলা সাংসদকে রাতে হেনস্থার ঘটনায় বাংলার মহিলাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মহুয়া অবশ্য ঘর না ছাড়ার অবস্থানে অনড়ই ছিলেন।