পিনাকী চক্রবর্তী ও রনি চৌধুরী
তীর্থ করতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না উত্তরবঙ্গের চার যুবকের। তারাপীঠের হোটেলের তৃতীয় তলে ছিলেন চার বন্ধু। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে চার জনেরই মৃত্যু হয়- ওষুধ ব্যবসায়ী অমিত পাল (৪০) ও বিমা কোম্পানির এজেন্ট সুবীর সাহা (৪০), দোকানের কর্মচারী রাকেশ শর্মা (৩২) এবং গাড়িচালক কমল রায়ের (৩৪)। এর মধ্যে প্রথম দু'জন আলিপুরদুয়ার শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নিউ টাউন ও সাত নম্বর ওয়ার্ডের দেশবন্ধু পাড়ার বাসিন্দা। কমলের বাড়ি আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের তোপসিখাতার পাকুড়িতলা আর ধূপগুড়ি পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাকেশ।
কমলের গাড়িতেই গত শুক্রবার আলিপুরদুয়ারের ওই দুই যুবক দেওঘরে যান। রবিবার রাতে তাঁরা দেওঘর থেকে তারাপীঠের ওই হোটেলে ওঠেন। সোমবার সকালে ওই তিন জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। মৃতদের ঠিকানা খুঁজতে শুরু হয় পুলিশি তৎপরতা। কিন্তু সরকারি ভাবে মৃতদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়, সেখানে আলিপুরদুয়ারের ঠিকানায় মৃত ওই তিন জন ছাড়াও 'রাজেশ শর্মা' নামের এক ব্যক্তির নাম থাকায় তাঁর হদিশ পেতে দিনভর হিমশিম খেতে হয় পুলিশ-প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমকে।
শেষে জানা যায়, মৃত ব্যক্তির প্রকৃত নাম রাকেশ শর্মা। তিনি অমিত ও সুবীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দেওঘর যাওয়ার সময়ে তিনি অমিতদের গাড়িতে রূপগুড়ি থেকে চেপেছিলেন। ঠেকের আলোচনায় অমিতই জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের সঙ্গে ধূপগুড়ি থেকে একজন যাবেন। তা থেকেই অনুমান করা হয়, এই চতুর্থ ব্যক্তি আলিপুরদুয়ারের নয়, ধূপগুড়ির বাসিন্দা। হোটেলে রুম নেওয়ার সময়ে বাকিরা আলিপুরদুয়ার লেখায়, রাকেশের ঠিকানাও একই রাখা হয়েছিল। এর পরেই নামবিভ্রাট কেটে বিষয়টি খোলসা হয়।
ধূপগুড়ির রাকেশের ছোট মেয়ের অন্নপ্রাশন হওয়ার কথা হিল কিছু দিন পরেই। তিন বন্ধুর সঙ্গে পুজো দিতে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফেরা হলো না। পাঁচ জনের সংসার টানতে দোকানে কাজ করতেন রাকেশ। মা রেণু শর্মা বলেন, 'ছেলে আলিপুরদুয়ারের তিন বন্ধুর সঙ্গে বাবা ধাম গিয়েছিল, তারাপীঠে পুজো দিয়ে বাড়ি ফেরার কথা। সকালে জানতে পারি, ওখানকার হোটেলে আগুন লেগে ছেলের শরীর ঝলসে গিয়েছে। খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।'
খবর পাওয়ার পর থেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন কমলের স্ত্রী। বৃদ্ধ্য মা কানে শোনেন না। তাঁর দুই ছেলেমেয়ের এক জন প্রথম শ্রেণি এবং অন্য জন পথম শ্রেণির পড়ুয়া। অমিতের পরিবারকে রাত পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। তবে বাড়ির সামনে উপচে পড়া ভিড় দেখে তাঁর স্ত্রী আড়াই বছরের ছেলেকে নিয়ে এতটাই গুটিয়ে যান, যে তাঁর সঙ্গে কেউই কথা বলতে পারেননি। সুবীরের বাড়িতে স্ত্রী এবং দশম শ্রেণির পড়ুয়া মেয়ে রয়েছে। দাদা সুজিত বলেন, 'ঠিক কী ভাবে যে শোক সামাল দিয়ে ভাইয়ের স্ত্রী আর মেয়েকে এই দুঃসংবাদ দেবো, বুঝতে পারছি না।'
আলিপুরদুয়ারের বিজেপি বিধায়ক পরিতোষ দাস খবর শোনামাত্রই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে মৃতদেহগুলি আলিপুরদুয়ারে নিয়ে আসার জন্যে তৎপর হন। বিধায়ক বলেন 'এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কিছু হতে পারে না। আমি নিজে শিলিগুড়ি থেকে দেহগুলি এনে পরিবারের হাতে তুলে দেবো। সব ধরনের সহযোগিতা করব।' জেলার পুলিশ সুপার অমিতকুমার শাহ বলেন, 'দেহগুলি পরিবারের হাতে সুষ্ঠু ভাবে তুলে দিতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।'