• ‘আর্থিক সাহায্য নয়, বাবার নামে ভালো স্কুল করুক সরকার,’ চাইছেন পিতৃহারা হাফিজ
    প্রতিদিন | ১৮ আগস্ট ২০২৬
  • শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো বড় সামাজিক ইস্যু নিয়ে কাজ করছিলেন। সেই কাজ যে তাঁর জীবনে এত বড় ক্ষতি ডেকে আনবে, কে-ই বা ভেবেছিল? ভাবেননি বাঁকুড়ার তরুণ শেখ আবদুল হাফিজও। কিন্তু তাঁর কাজকর্মের জন্য আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দিয়ে হল বাবা, শেখ মাফিককে! দিন কয়েক আগে ইন্দাসের করিশুন্ডা গ্রামে হাফিজের বাড়িতে দুষ্কৃতীদের হামলার মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেকে বাঁচাতে পারলেও নিজেকে পারেননি পঞ্চাশোর্ধ্ব মাফিক। মারধরের জেরে রবিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয় বর্ধমান হাসপাতালে। সদ্য পিতৃহারা ছেলে কিন্তু এর মাঝেও নিজের আদর্শের কথা মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি। দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকের মৃত্যুর পর সংসার চালানোর জন্য হাফিজকে অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য দাবি করার। কিন্তু সেই পরামর্শ হেলায় উড়িয়ে তরুণ বলছে, ‘‘আমাদের আর্থিক সাহায্য দরকার নেই। বাবার নামে বাংলার যে কোনও জায়গায় যেন একটা বিশ্বমানের স্কুল তৈরি হয়, সরকারের কাছে এটাই চাই।”

    পিতৃশোকের মাঝে দৃঢ়কণ্ঠে হাফিজের এই চাওয়া এখন সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সকলের মুখে মুখে ফিরছে তাঁর কথা। হাফিজের প্রশংসা করে অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। সোমবার হাফিজের ইন্দাসের বাড়িতে গিয়েছিলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা-সহ বেশ কয়েকজন। কারণ, ‘ককরোচ’দের আন্দোলনে যোগ দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতির জন্য লড়াই করেছিলেন হাফিজ। পরে নিজের গ্রামে ফিরেও সেই লড়াই জারি রেখেছিলেন। এলাকার প্রাথমিক স্কুলের বেহাল দশা দেখে প্রধান শিক্ষক ও প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ করে হাল ফেরাতে চেয়েছিলেন ইন্দাসের ছাত্র। এই সাধু উদ্যোগের মাশুল তাঁকে গুনতে হল বাবাকে হারিয়ে। সোমবার ‘ককরোচ’ প্রতিনিধিদের পাশাপাশি হাফিজের বাড়ি গিয়েছিলেন সিপিএমের শতরূপ ঘোষ, এসএফআইয়ের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাসরা। তাঁরাই হাফিজকে পরামর্শ দেন, সরকারকে আর্থিক সাহায্যের জন্য চাপ দিক।

    আশুতোষ, শতরূপদের পরামর্শ হেলায় উড়িয়েছেন হাফিজ। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে সোমবার সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কোনও আর্থিক সাহায্য চাই না। যদি সরকার মনে করে, আমাদের কোনও ক্ষতি হয়েছে তাহলে বাংলার যে কোনও প্রান্তে একটা বিশ্বমানের স্কুল তৈরি করুক, তার নাম দিক আমার বাবার নামে। সেই স্কুলে যেন সবাই বিনামূল্যে ভালো শিক্ষা পায়। আমরা তো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নতির লড়াইয়ে নেমেছি। তা না করা পর্যন্ত এই লড়াই শেষ হবে না।”

    একই বক্তব্য হাফিজের মায়েরও। প্রিয়জনকে হারিয়েও ব্যক্তিগত শোক তো আছেই, কিন্তু তারও উপরে দেশের স্বার্থের কথাই শোনা গেল তাঁর গলায়। মৃত মাফিকের মা অর্থাৎ হাফিজের ঠাকুমা জাহানারা বেগম ছেলের মৃত্যুর পর থেকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। যতক্ষণ তিনি সুস্থ রয়েছেন, কান্নাকাটির মাঝেও বলে চলেছেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। বলছেন, সবাই সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক। এটাই বোধহয় দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় নজির।
  • Link to this news (প্রতিদিন)