রূপক মজুমদার
অ্যাকশন সিনেমায় চোখ ধাঁধানো ফাইটিং সিকোয়েন্স। সেখানে হাতে হাতে ঘোরে বন্দুক। পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর কোনও সদস্যের কাছে নিয়ম মতোই বন্দুক থাকে। দুষ্কৃতীদের হাতেও বন্দুক থাকে — অপরাধের খবরেই আকছার সে সব শোনা যায়। সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজ়াদ জানিয়েছেন, নিরাপত্তার জন্য তিনি আর্মস লাইসেন্স করাবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ? তাঁরা কী বন্দুক নিতে পারেন? ভারতের ক্ষেত্রে আইন মেনে সাধারণ মানুষ বন্দুক বা নির্দিষ্ট ধরনের ফায়ার আর্মস নিতেই পারেন। কী ভাবে লাইসেন্সের আবেদন করা যায়? কী শর্ত পূরণ করতেই হবে? এই প্রতিবেদনে থাকল সেই সব প্রশ্নের উত্তর।
ভারতে অস্ত্র আইন (Arms Act, 1959) এবং অস্ত্র বিধি (Arms Rules, 2016) অনুযায়ী, আত্মরক্ষা,
ব্যবসা এবং
খেলা (Sports Shooting)
এই তিনটি ক্যাটিগরিতে ফায়ার আর্মস লাইসেন্স দিয়ে থাকে সরকার।
আত্মরক্ষার জন্য ফায়ার আর্মস লাইসেন্স নেওয়ার শর্ত:
ব্যক্তিগত জীবন বা সম্পত্তি রক্ষার্থে এই লাইসেন্স দেওয়া হয়, তবে এর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে হয়। আবেদনকারীর জীবন বা সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে ঝুঁকি রয়েছে, এমন ব্যক্তি এই লাইসেন্স পেতে পারেন। এর জন্য বেশ কিছু প্রমাণ ও নথিপত্র প্রয়োজন।
১. এফআইআর (FIR) বা জিডি (GD) কপি।
২. আগে কোনও আক্রমণ হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে বা ব্ল্যাকমেলিং করা হয়েছে, এমন অভিযোগের পুলিশি রেকর্ড।
৩. হুমকির চিঠি বা ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া হুমকির কোনও প্রমাণ।
এ ছাড়াও, যদি কোনও ব্যক্তি এমন কোনও সংবেদনশীল সরকারি পদে থাকেন বা এমন কোনও সামাজিক অবস্থানে থাকেন, যে কারণে তাঁর জীবনে বড় ঝুঁকি রয়েছে, তাঁরা এই লাইসেন্সের আবেদন করতে পারেন। এ সব ক্ষেত্রে সাধারণত নন-প্রহিবিটেড বোর (NPB) ক্যাটিগরির বন্দুক যেমন পিস্তল, রিভলবার বা শটগান-এর জন্য আবেদন করা যায়।
ব্যবসার সুরক্ষার জন্য:
যে সব ব্যবসায় বড় অঙ্কের নগদ বা মূল্যবান সামগ্রী লেনদেন করতে হয়, সেই ব্যবসার মালিক বা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য এই লাইসেন্স দেওয়া হয়। যেমন গয়না ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্ক বা নগদ লেনদেনের এজেন্সি, পেট্রল পাম্প বা বড় ডিস্ট্রিবিউটর, যেখানে দৈনিক বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা কাউন্টারে জমা হয়। তারা এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারে।
এক্ষেত্রে নথি হিসেবে প্রয়োজন
১. ট্রেড লাইসেন্স-সহ নির্দিষ্ট ব্যবসার লাইসেন্স।
২. কোম্পানির ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট।
৩. আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ
৪. বার্ষিক টার্নওভারের খতিয়ান
৫. জিএসটি (GST) রিটার্ন
৬. ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন (ITR)
খেলাধুলা বা Target Practice-এর জন্যও বন্দুকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। শুধু ক্রীড়াবিদেরা এই লাইসেন্স পান। তাঁদের কী কী নথি লাগে?
১. আবেদনকারীকে কোনও স্বীকৃত শুটিং ক্লাব বা রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য হতে হবে।
২. ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (NRAI) বা রাজ্য রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অনুমোদিত মেম্বারশিপ কার্ড ও সার্টিফিকেট।
৩. শুটার আইডি কার্ড (স্পোর্টস ক্যাটাগরির জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র)
৪. ২ বছর ধরে বিভিন্ন জেলা, রাজ্য বা জাতীয় স্তরের শুটিং প্রতিযোগিতায় সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণের প্রমাণ।
জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বন্দুক কেনার লাইসেন্স পাওয়া মানেই সব ধরনের বন্দুক কেনা যাবে, এমনটা একেবারেই নয়। তিনি জানাচ্ছেন, কোনও ধরনের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান বা কোনও সামরিক অস্ত্র যা সেনাবাহিনী ব্যবহার করে, সেগুলো কেনা যায় না। এ ছাড়াও ৩০৩ রাইফেল, ৭.৬২ এমএম এবং সামরিক ব্যবহারের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আগ্নেয়াস্ত্র কেনা যায় না। বৈধ লাইসেন্স থাকলে শটগান ও স্মুদ বোর (একনলা বা SBBL অথবা দুই নলা বা DBL) বন্দুক কেনা যায়। লাইসেন্সের ধরনের উপরে নির্ভর করে ৯ এমএম পিস্তলও পাওয়া যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অনেক শর্ত থাকে বলে জানাচ্ছেন জেলা পুলিশের আধিকারিক।
আবেদনের ন্যূনতম বয়স:
ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে গেলে অন্তত ২১ বছর বয়স হতে হবে।
স্পোর্টস শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সীরা আবেদন করতে পারেন।
কোন পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে:
প্রতিটি জেলায় জেলাশাসকের অধীনে একজন করে আধিকারিক থাকেন, যিনি আবেদন ফর্ম (Form A-1) অনলাইন বা অফলাইনে পূরণ করার পরে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাবেন। সেখান থেকে জেলা গোয়েন্দা দপ্তরের রিপোর্ট আসবে। তারপরে সেটি আবার জেলাশাসকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওই আধিকারিকের কাছে আসবে। তিনি সব কিছু খতিয়ে দেখার পরে যাবতীয় তথ্য ঠিক থাকলে তা জেলাশাসকের কাছে পাঠানো হবে। এরপরে জেলাশাসক সব তথ্য খতিয়ে দেখে তারপরেই অনুমতি দেওয়া হবে।
https://ndal-alis.gov.in/- এই ওয়েবসাইটে লাইসেন্স এবং আবেদনের তথ্য রয়েছে।