বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের জেরে রবিবার গভীর রাত থেকেই ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। সোমবার দিনভর ভারী বৃষ্টি হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায়। বৃষ্টির জেরে অনেক জায়গাতেই বেড়ে গিয়েছে নদীর জলস্তর। এর ফলে বহু জায়গায় বসত বাড়ির মধ্যে জল ঢুকে গিয়েছে। আবার বৃষ্টির জেরে জল জমে গিয়ে অনেক জায়গায় জলের তলায় চাষের জমি। সব মিলিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া-সহ অন্যান্য জেলাগুলিতে বন্যা পরিস্থিতির ছবিটা ঠিক কেমন?
সোমবার সারাদিন একটানা ভারী বৃষ্টির পরে মঙ্গলবার কিছুটা উন্নতি হয়েছে আবহাওয়ার। বৃষ্টি থেমে রোদ উঠতেই জলস্তর নামতে শুরু করেছে হলদিয়ায়। তবে, ভগবানপুর, পটাশপুর-সহ একাধিক জায়গায় পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ঝড়বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গাতেই বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়াও, হলদিয়া-সহ গোটা জেলাজুড়েই স্থানীয়দের সচেতন করতে চলছে মাইকিং। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষের সমস্যা খতিয়ে দেখছে। পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও মঙ্গলবার ত্রাণশিবিরগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন। যে কোনও সমস্যায় সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন মন্ত্রী।
বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর:
হলদিয়ার জন্য কন্ট্রোল রুমের নম্বর - 7908521200। জেলার অন্যান্য জায়গার জন্য কন্ট্রোল রুমের নম্বর - 03228-262728।
একটানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। কেলেঘাই নদীতে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় সবং, নারায়ণগড়, মোহনপুর, দাঁতন কেশিয়াড়ির একাধিক জায়গায় জল জমে রয়েছে। কোনও কোনও জায়গায় কোমর সমান জল জমে রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলায় সমস্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষিকাজও। পশ্চিম মেদিনীপুরের বিঘার পর বিঘা জমিতে কোমর সমান জল দাঁড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন জল জমে থাকলে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিজন কৃষ্ণ জানান, মোহনপুর এবং সবং ব্লক এলাকায় ৩০টি সরকারি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। দুর্গত মানুষদের উদ্ধারের জন্য কাজ করছে বিশেষ দল।
বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর: 03222-275894
নিম্নচাপের কারণে একটানা বৃষ্টির জেরে কংসাবতী, শিলাবতী-সহ বাঁকুড়ার সব নদীতেই জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে খবর, সোমবার সকাল সাড়ে আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে বাঁকুড়া জেলায় মোট ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে, সোমবার সন্ধ্যায় মুকুটমণিপুরে কংসাবতী জলাধার থেকে ৫০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়। এর ফলে আরও ভয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নদীগুলির উপরে থাকা সেতু ও কজ়ওয়ে জলের তলায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্য দিকে, দ্বারকেশ্বর নদীতে জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় মিনাপুর, ভাদুল, কেঞ্জাকুড়া-সহ একাধিক জায়গায় সেতু জলের তলায়। চরম দুর্ভোগে মানুষ। এ ছাড়াও, মঙ্গলবার সকালে গন্ধেশ্বরী নদীতে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় মানকানালী সেতু দিয়ে পারাপারের সময় লোহার রড বোঝাই একটি ট্রলার আটকে পড়ে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন চালক। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই সেতুর সংস্কারের কথা বলা হলেও প্রশাসনের তরফে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষিকাজও। গন্ধেশ্বরী নদীর পাড় ভেঙে গিয়ে জলের তলায় বাঁকুড়া-২ ব্লকের মাতলাপাড়ার ৭ একর কৃষিজমি। চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে গ্রামের ৪০ টি কৃষিজীবী পরিবার।
বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর: 03242254375, 0324224025
নিম্নচাপের জেরে ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে ঝাড়গ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ অংশ। সুবর্ণরেখা, কংসাবতী, ডুলুং নদীর জল বাড়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু জায়গায়। বেলপাহাড়ি ব্লকের এঁটালায় তারাফেনী নদীর উপর ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া ৫ নম্বর রাজ্য সড়কের কালভার্ট জলের তলায় চলে যাওয়ায় ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ার মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। অন্য দিকে, ডুলুং নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় চিল্কিগড়ের কজ়ওয়েটি জলের তলায় চলে গিয়েছে। এর ফলে ঝাড়গ্রাম জেলা সদর থেকে জামবনি ব্লক সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এ ছাড়াও তপসিয়ায় ৯ নম্বর রাজ্য সড়কের উপরেও জল জমে রয়েছে । ফলে ঝাড়গ্রাম জেলা সদরের সঙ্গে গোপীবল্লভপুরের যোগযোগ বিচ্ছিন্ন। গোপীবল্লভপুর-১ ব্লকের করবনিয়া, গোপীবল্লভপুর-১ ব্লকের মালঞ্চা এবং নয়াগ্রাম ব্লকের নদী তীরবর্তী এলাকায় নদী পাড় ভাঙনের মুখে।
বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর: 03221-258228
সোমবার সন্ধ্যা থেকে টানা বৃষ্টির জেরে আসানসোলের একাধিক এলাকা জলমগ্ন। রাস্তায় জল জমার পাশাপাশি অনেক বাড়িতেও জল ঢুকে গিয়েছে। আসানসোলের রেলপাড়, বস্তিন বাজার, বরাকর-সহ একাধিক জায়গায় জল জমে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাড়ির মধ্যে জল ঢুকে যাওয়ার কারণে আসবাব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলেও ত্রাণের কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। চরম দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন স্থানীয়রা। নিম্নচাপ সরে গেলেও এখনও প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি চলছে। বৃষ্টি না কমলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আসানসোলের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় এই হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছেন - 9593222255।