• Kolkata Hotel Fire: বাংলাদেশিরা চিকিৎসা করাতে এসে ওঠেন এই হোটেলগুলিতে, অভিজ্ঞতা কেমন, নিজেরাই জানাচ্ছেন...
    এই সময় | ১৯ আগস্ট ২০২৬
  • ধর্মতলার মির্জ়া গালিব স্ট্রিট। মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে সেখানকার একটি হোটেলে। নাম ‘শিখা ইন’। নিউ মার্কেট থানা এলাকার অন্তর্গত ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দমবন্ধ হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই চত্বরজুড়ে মূলত যে হোটেলগুলি রয়েছে, সেখানে ভিন রাজ্য থেকে বহু মানুষ এসে ওঠেন। আর চেক-ইন করেন বহু বাংলাদেশিও। চিকিৎসার জন্য মূলত কলকাতায় আসেন, এমন বহু বাংলাদেশি থাকেন এই হোটেলগুলিতে। আগুন লাগার খবর পেয়ে এ দিন ঘটনাস্থলে যান বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার মহম্মদ খালেদ। ৯ জনের মধ্যে একজন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা, সে তথ্য ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে। এখন বাকি ৮ জনের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন বা সকলেই বাংলাদেশি কি না, তা এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

    বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার মহম্মদ খালেদ জানান, ‘বাংলাদেশ থেকে বার বার ফোন আসছে। মোট ৯ জন মারা গিয়েছেন। একজন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। তবে এখনও পর্যন্ত পুলিশ দেহ শনাক্ত করার ব্যাপারে কিছু জানায়নি। আপাতত দেহ মর্গে রাখা আছে।’ পুলিশের তরফে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার। মহম্মদ খালেদ বলেন, ‘মৃতদেহগুলি শনাক্ত করে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব। ইতিমধ্যেই বিদেশমন্ত্রকের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনেকে যোগাযোগ করছেন। ২৪ ঘণ্টা আমরা যোগাযোগ রাখছি।’

    বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় এসেছেন মহম্মদ শামিম হোসেন। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা এই সময় অনলাইনকে জানান, মোটামুটি প্রতি বছরই কলকাতায় আসেন তিনি। ঘুরতে আসেন, সঙ্গে চিকিৎসাও। শামিমের মতোই ঢাকা থেকে এ শহরে এসেছেন ইয়ার মহম্মদ কালো। তিনি জানান, ১৯৮৪ থেকে প্রতি বছর কলকাতায় আসছেন। এর আগে ‘শিখা ইন’ হোটেলে তিনি থেকেওছেন। কী অভিজ্ঞতা তাঁর? ইয়ার মহম্মদের কথায়, ‘বিদ্যুতের তারগুলি বহু পুরোনো। সেই তার থেকে শর্ট সার্কিট হওয়ার সম্ভাবনাই সব থেকে বেশি।’ মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় চিন্তিত ইয়ার মহম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঢাকার যে কেউই এখানে থাকতে পারেন। যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো আমার পরিচিত কেউও রয়েছন। আমি তো বুঝতে পারছি না ঢাকার লোক মারা গিয়েছেন নাকি অন্য কোনও জেলার কারও মৃত্যু হয়েছে। চিন্তা তো হচ্ছেই।’

    ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মির্জ়া গালিব স্ট্রিটজুড়ে যে হোটেলগুলো রয়েছে, ২০-৩০ বছর আগেও তার বেশির ভাগই ছিল রেসিডেনশিয়াল ঠিকানা। অর্থাৎ হোটেল ব্যবসা নয়, জনবসতিপূর্ণ ছিল ওই এলাকা। স্থানীয় সূত্রে খবর, এখন বিস্তীর্ণ এলাকার অর্ধেকই ব্যবসায়িক কারণে (কর্মাশিয়াল পারপাস) ব্যবহৃত হচ্ছে। চারটে-পাঁচটা রুম নিয়ে একটা হোটেল তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম-নীতির বালাই নেই, অভিযোগ এমনটাই।

    এ প্রসঙ্গে পূর্বতন সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, দমকলের প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। পাল্টা মুখ খুলেছেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহামও। গোটা ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন দমকল প্রতিমন্ত্রী। ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের বেশি বড় যে সব ঘর, সেগুলি কী ভাবে এতদিন ওই চত্বরজুড়ে রয়েছে, প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে ওই এলাকায় ফি বছর আসা অনেকেরও একই অভিযোগ, সে সব হোটেলে না আছে ভেন্টিলেশন, না আছে যথাযথ চলাচলের জায়গা। সবথেকে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হোটেলগুলির অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা।

    এ দিনের ঘটনার পরে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অনেকেই। বলছেন, ঘণ্টা হিসেবেও ভাড়া দেওয়া হয় কোনও কোনও হোটেলের ঘর। সে ক্ষেত্রে ঘণ্টাপিছু ২ হাজার-আড়াই হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। অনেকে আবার ঘর ভাড়া দেন ১৫-২০ দিন বা এক মাসের জন্য। তখন ভাড়া অনেকটাই কম নেওয়া হয়। তবে ঘরগুলির অধিকাংশই কার্যত মৃত্যুপুরী, অভিযোগ স্থানীয়দের একটা বড় অংশের। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে আসা বহু পরিবার এখানে এসে ওঠে। এত মানুষকে টাকার বিনিময়ে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়, অথচ নিরাপত্তা তলানিতে? এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে মির্জ়া গালিব স্ট্রিট জুড়ে।

    অকুস্থল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে দমকলের হেড কোয়ার্টার, কলকাতা পুরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবন। অথচ অভিযোগ, এখানে ৩০-৪০ বছরের পুরোনো রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিংগুলিকে গত কয়েক বছরে ইচ্ছেমতো কমার্শিয়াল করে তোলা হয়েছে। যেখানে একটা এসি মেশির থাকার কথা, সেখানে এসি বসানো হয়েছে ১০টি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অগ্নিমিত্রা পাল প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমার জায়গায় আগে যিনি ছিলেন, উনি কী করেছেন? ট্রেড লাইসেন্স দিল কে? সিইএসসি কী করে অনুমতি দিল? একটা এসির পারমিশন নিয়ে ১০টা চালানো হয়েছে।’ এক একটি ফ্লোরে ৪-৫টি হোটেল। কী ভাবে হলো এগুলো? কারও নজরে পড়ল না? নাকি সবই হয়েছে ‘নজরদারিতে’ই?

    তথ্য সহায়তা: শিলাদিত্য কর, সোমনাথ মণ্ডল, প্রীতম দে, শ্যামগোপাল রায়, ইন্দ্রনীল সাহা, অর্পিতা হাজরা

  • Link to this news (এই সময়)