• মুসলিম বাড়ির মন্দিরে মনসা পুজো, আরাধনা হিন্দু ভক্তদের, পুরুলিয়ায় সম্প্রীতির ছবি
    এই সময় | ২০ আগস্ট ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল

    উঠোনের এক কোণে ছোট্ট মন্দির। সেখানে অধিষ্ঠান করছেন মৃন্ময়ী দেবী মনসা। ধূপের গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ। নিয়ম মেনে চলছে দেবী মনসার পুজো। কিন্তু পুজোটা হচ্ছে শেখ পাড়ার এক মুসলিম পরিবারের উঠোনে। আর ভক্তি ভরে পুজো দিচ্ছেন হিন্দুরা। পুরুলিয়ার বোরো থানার আঁকরো গ্রামের এই দৃশ্য অবশ্য নতুন কিছু নয়।

    ধর্ম পরিচয় এখানে মন্দিরের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই থেমে যায়। দেবীর সামনে সবাই এক—ভক্ত। ঠিক কত বছর ধরে এই পুজো হয়ে আসছে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারলেন না পরিবারের সদস্য শেখ কালিম। তাঁর কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখছি। বড়দের মুখে শুনেছি, স্বাধীনতার আগে থেকে এভাবেই দেবী মনসার আরাধনা হয়ে আসছে।’

    আঁকরো গ্রামে মুসলিম পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা—মেরেকেটে ১০-১২টি ঘর। হিন্দু পরিবারের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। কিন্তু মনসা পুজোর দিন সেই সংখ্যার অর্থহীন হয়ে যায়। শেখ কালিমের কথায়, ‘জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গ্রামের মানুষ পুজোয় অংশ নেন।’ এটাই তাঁদের গ্রামের ‘ষোলো আনা’ বা সর্বজনীন পুজো।

    পরিবারের আর এক সদস্য বুধু শেখ জানালেন, অনেকে মানতও করেন। তাঁর কথায়, ‘মানত পূরণ হলে দেবীর কাছে পুজো দেন ভক্তরা।’ তাঁর মতে, প্রার্থনা আর বিশ্বাসের জায়গায় ধর্মের বিভাজন কোনও দিনই জায়গা করে নিতে পারেনি। ভক্ত তপন মাহাতোর কথায়, ‘মুসলিম পরিবারের বাড়িতে এই পুজো হয়—এটা শুনে হয়তো অনেকেরই অবাক লাগতে পারে। কিন্তু এই পুজোয় গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলি যে ভক্তি আর নিষ্ঠা নিয়ে অংশ নেয়, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।’

    এই পুজো তাই কারও একার নয়। দেবী মনসার মন্দিরটি একটি পরিবারের উঠোনে হলেও পুজো গোটা গ্রামের। উত্তরাধিকার সূত্রে পুজো করেন কালু শেখ। তিনিই পুরোহিত। পুজোর দিন উপবাস করেন। রাতে মৃন্ময়ী দেবীর সামনে নিয়ম মেনে পুজোয় বসেন। কালু শেখের কথায়, ‘আমার বাড়িতেই মন্দির। দীর্ঘদিন ধরে পুজো করছি।’

    পুজোর আগে দেবীর সামনে নৈবেদ্য-সহ ডালা দেওয়ার রীতি রয়েছে। পুজো শেষে মন্দির থেকে সেই ডালা বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে মাথায় ঠেকান গ্রামের বধূরা। কল্পনা মাহাতো, লুলকি মাহাতোর মতো বহু মহিলার কাছে এই রীতি নতুন কিছু নয়। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে আসা থেকেই তাঁরা দেখে আসছেন এই পুজো, ডালা দেওয়ার রীতি।

    তবে অন্যতম আকর্ষণ ‘জাতমঙ্গল’ অনুষ্ঠান। এ হলো গান লোকাচার, অনুষ্ঠানের এক অভূতপূর্ব আয়োজন। শিল্পী রোহিন সিংহ জানালেন, সারা বছর এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা। পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই লোকাচার, গান, অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে মনসা পুজো হয়ে ওঠে গ্রামের নিজস্ব উৎসব।

  • Link to this news (এই সময়)