• হোটেল তো নয়, যেন জতুগৃহ, অগ্নি-নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ পর্যবেক্ষক দল, আশ্বাস উমেশের
    এই সময় | ২০ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়, হাওড়া: নামেই হোটেল! কিন্তু আদতে সেগুলি আবাসিক বাড়ি। কোনওটার বয়স ৫০ বছর পার হয়ে গিয়েছে। পুরোনো জরাজীর্ণ বিল্ডিংয়ে ঘর ভাড়া নিয়ে চলছে হোটেল ও লজ। রোজ শত শত মানুষ সেখানে রুম ভাড়া নিয়ে থাকছেন। অথচ, সেখানে না আছে কোনও অতিরিক্ত সিঁড়ি কিংবা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ঘরের সিলিংয়ে, দেওয়ালে যত্রতত্র ঝুলছে বিদ্যুতের তার। সরু সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময় গায়ে গা লেগে যায়। নেই কোনও জলের রিজ়ার্ভার। এই ভাবেই সরকারি নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাওড়া স্টেশনের আশপাশে বছরের পর বছর ধরে চলছে অজস্র হোটেল ও লজ।

    উত্তর হাওড়ার বিধায়ক তথা রাজ্যের পূর্ত ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইয়ের ব্যাখ্যা, হাওড়া স্টেশন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই হোটেল ব্যবসা চলছে। অধিকাংশ হোটেলের লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স নেই। সেগুলো দেখার জন্য একটি বিশেষ দল তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন হোটেলগুলির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন। পুরসভার হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি হোটেল ও লজ রয়েছে। হাওড়া স্টেশন কাছে হওয়ায় সারা বছরই সেখানে অতিথিদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যুর পরে হাওড়া স্টেশন লাগোয়া এই সব হোটেল ও লজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

    কয়েক দশক আগে পুরসভার অনুমোদন নিয়েই হাওড়া স্টেশন লাগোয়া ডবসন লেনে তৈরি হয়েছিল একটি পাঁচতলা বাড়ি। পরবর্তীতে সেই বাড়ি হোটেলে পরিবর্তিত হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, আগে বাড়িটি মানুষের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই বিল্ডিংয়ের মধ্যেই একাধিক হোটেল ও লজ চলছে। অভিযোগ, সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তার কোনও বালাই নেই। আইন অনুযায়ী, যে কোনও বাণিজ্যিক ভবনে জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসার জন্য বিকল্প সিঁড়ি ও রাস্তা থাকার দরকার। কিন্তু এই বাড়িতে সে সব কিছুই নেই। যে সিঁড়ি রয়েছে সেখানে একসঙ্গে দু'জন লোক স্বচ্ছন্দে ওঠানামা করতে পারে না। ফলে সেখানে যদি কখনও আগুন লাগে হোটেলের আবাসিকদের পক্ষে বেরিয়ে আসাই মুশকিল হবে।

    স্থানীয়দের অভিযোগ, ডবসন লেন এবং তার আশপাশে যত হোটেল ও লজ রয়েছে, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি নেই বললেই চলে। থাকলেও সেগুলিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। অনেক হোটেলেই স্প্রিঙ্কলার, হোস পাইপ, ফায়ার অ্যালার্মের মতো জরুরি সরঞ্জাম নেই। বিদ্যুতের তারগুলো সবই পুরোনো। কোথাও আবার মাথার উপরে তার ঝুলছে। ফলে শর্ট সার্কিটের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না হোটেলের কর্মীরাও।

    ডবসন লোনের বাসিন্দা রাহুল সোনকার বলেন, 'যে ভাবে পুরোনো বসতবাড়িগুলিকে হোটেল ও লজে পরিণত করা হয়েছে, তাতে যে কোনও দিন বিপদ ঘটতে পারে। হোটেলে আগুন লাগলেও আমরাও রেহাই পাব না। প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন হোটেল ও লজগুলির অগ্নিনিরাপত্তা খতিয়ে দেখা হোক।'

    হুগলির শৈবতীর্থ তারকেশ্বরে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় শ'দেড়েক হোটেল ও লজ রয়েছে। সেখানেও অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। মন্দির চত্বর, স্টেশন লাগায়ো এলাকা এবং তারকেশ্বর বাসস্ট্যান্ডর আশপাশে এই ধরনের প্রচুর হোটেল রয়েছে। তীর্থযাত্রীরা ছাড়াও বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরাও সেখানে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। শ্রাবণী মেলার মতো তারকেশ্বরে কোনও বড় অনুষ্ঠান থাকলে তার আগে পুলিশ কিছুটা নজরদারি চালালেও বছরের বাকি সময় প্রশাসনের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। অনেক হোটেল রয়েছে আবাসিক বাড়ির মধ্যেই। একই ভবনে রয়েছে খাবার হোটেল। সেখানে গ্যাস ও কয়লার উনুন জ্বালিয়ে দিবারাত্র রান্না হচ্ছে। ফলে তা থেকে যে কোনও দিন হোটেলে বড়সড় অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

  • Link to this news (এই সময়)