• Kolkata Fire: রক্তের রং চেরি লাল! নেপথ্যে বিষাক্ত ধোঁয়া
    এই সময় | ২০ আগস্ট ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    রক্তের রং চেরি–রেড, কালচে গাঢ় লাল নয়। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অধীন ক্যালকাটা পুলিশ মর্গে পর পর ট্রলিতে রাখা ন'টি দেহে দগ্ধে যাওয়ার বিশেষ নিশান নেই। ঠিক ১৫ বছর আগে আমরি, ঢাকুরিয়ার অগ্নিকাণ্ডে যেমনটা দেখা গিয়েছিল। ময়না-তদন্তের জন্য শব ব্যবচ্ছেদ করেও দেখা গেল, মৃত্যুর কারণ সেই কার্বন মনোক্সাইড পয়জ়নিং।

    ময়না-তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে অনুমান, মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে এক শিশু ও দুই মহিলা-সহ ন'জনের মৃত্যুই হয়েছে পুড়ে নয়, মূলত দম আটকে। কারণ, দেহগুলির রক্তের রং উজ্জ্বল চেরি-লাল এবং ত্বকের নীচের অংশ ও মিউকাস আবরণগুলোর রং গোলাপি লাল। ময়না-তদন্তকারী চিকিৎসকদের দাবি, এটা কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনের রং। যা থেকে বোঝা যায়, মৃত্যু এসেছে কার্বন মনোক্সাইড পয়জ়নিংয়ে ভর করে। ভিলেন সেই কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে মৃতদের রক্তের নমুনা পাঠানো হয়েছে বেলগাছিয়ার ফরেন্সিক সায়েন্সেস ল্যাবে।

    ফরেন্সিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু সব সময়ে সরাসরি দগ্ধ হয়ে হয় না। বদ্ধ জায়গায় আগুন জ্বললে অক্সিজেনের ঘাটতিতে অসম্পূর্ণ দহনের ফলে বিপুল কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হতে পারে। এই বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাস দ্রুত শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তে মিশে যায়। বিপদ বাঁধে তখনই। ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে যে হিমোগ্লোবিন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দেয়, রক্তের সেই হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বসে কার্বন মনোক্সাইড। তাতেই হিমোগ্লোবিন বদলে যায় কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনে।

    চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অত্যন্ত দ্রুত এই বিক্রিয়া ঘটে। কারণ, অক্সিজেনের তুলনায় হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে কার্বন মনোক্সাইড যুক্ত হয় প্রায় ২০০ গুণ বেশি গতিতে। আর হিমোগ্লোবিনের কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ায় রক্তের অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সারা শরীরের টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছতে পারে না। বাইরে থেকে শ্বাস চললেও কার্যত অক্সিজেনের অভাবে মরতে বসে শরীরের কোষ।

    প্রথমে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, মাথাব্যথা বা বমি ভাবের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কালো ধোঁয়ার ঘনত্ব বেশি হলে দ্রুত জ্ঞান হারানো, খিঁচুনি, হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দের গোলমাল ও শেষে মস্তিষ্ক এবং হৃদ্‌যন্ত্রে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি হয়ে মৃত্যু হতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়া ও উত্তাপের মধ্যে আটকে থাকা মানুষ অনেক সময়ে পুড়ে যাওয়ার আগে এই পর্যায়ে পৌঁছে প্রাণ হারান। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দহনে তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ায় মৃতের রক্তের রং হয় কালচে গাঢ় লাল।

    এ দিন মৃতদের দেহ অবশ্য দগ্ধ হওয়ার আগেই উদ্ধার করা হয়। কার্বন মনোক্সাইড পয়জ়নিংয়ে তাঁরা যে জ্ঞান হারিয়েছিলেন ঘুমের মধ্যে, সেই জ্ঞান আর ফেরেনি। এর মধ্যে একমাত্র ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাসোয়ানের (১৯) বুকে, পেটে আংশিক দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন মিলেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, যে ফ্রিজে়র সামনে শুয়ে ছিলেন সন্দীপ, সেটির কমপ্রেশার ফেটে গিয়েই এই বুক-পেট পুড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে মৃত্যু হয়েছে দমবন্ধ হয়ে। ময়না-তদন্তকারীদের মতে, শুধু চেরি-রেড রং দিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। নিশ্চিত হতে রক্তে কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি নির্ণয় জরুরি।

    ২০১১-র ডিসেম্বরে আমরির অগ্নিকাণ্ডে ৯২ মৃত্যুর নেপথ্যে ধোঁয়া ও কার্বন মনোক্সাইডে দমবন্ধ হওয়ার কথা জানা গিয়েছিল ময়না-তদন্তে। এ বারও ময়না-তদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ সে দিকেই ইঙ্গিত করছে, ন'টি প্রাণ কেড়েছে বিষাক্ত ধোঁয়া।

  • Link to this news (এই সময়)