এই সময়: ছিল রুমাল, গত চার–পাঁচ বছরে সেটাই যেন হয়েছে বিড়াল!
মির্জা গালিব স্ট্রিটে দমকলের সদর দপ্তর থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে ছ'তলা যে বাড়িতে মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে, সেই বাড়িটির ক্ষেত্রে যেন এই কথাটাই খাটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিউ মার্কেট থানা এলাকায় ওই পুরোনো বাড়িটি আগে মূলত আবাসিক ভবন ছিল।
গত চার পাঁচ বছরে দু'টি পৃথক ভবনকে জোড়া লাগিয়ে ইংরেজি 'এল' আকৃতির এই কাঠামোটিকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া হয়। ভবনের প্রতি ফ্লোরে ছোট ছোট ঘুপচি ঘরকে আলাদা আলাদা ভাবে লিজে নিয়ে চলছিল অন্তত আট-দশটি হোটেল, যার অন্যতম তিন তলার 'শিখা ইন'।
এই হোটেলের প্রতিটি নার নন-এসি ঘরের ভাড়া দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং এসি ঘরের ভাড়া ৮০০ টাকার আশপাশে। ভিন রাজ্যের পাশাপাশি মূলত বাংলাদেশ থেকে নানা কারণে এ দেশে আসা সাধারণ মানুষ এই হোটেলগুলিতে ওঠেন। বছরের বেশিরভাগ সময়েই হোটেলের অনেক ঘর ভর্তি থাকে। কিন্তু লাভের অঙ্ক বাড়াতে গিয়ে 'শিখা ইন'-সহ অন্য হোটেলগুলির সুরক্ষায় চরম অবহেলা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ওই হোটেলগুলিতে কোনও ইর্মাজেন্সি গেট ছিল না। যাতায়াতের জন্য ছিল মাত্র একটি অত্যন্ত সরু সিঁড়ি এবং সিংহভাগ ঘরেই ছিল না পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা। আগুন নেভানোর ন্যূনতম কোনও পরিকাঠামোও সেখানে ছিল না। এমনকী, বুধবার রাত পর্যন্ত হোটেল কর্তৃপক্ষ ফায়ার লাইসেন্স বা ট্রেড লাইসেন্স কিছুই দেখাতে পারেননি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। অগ্নিকাণ্ডের পরে আপাতত ওই বহুতলে যাবতীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, আবাসিক ভবনকে সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে পিলার কেটে ঘরের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। এই বহুতলের উল্টো দিকের একটি হোটেলের কর্মী ইন্দ্রদেব হালদারের কথায়, 'মঙ্গলবার রাত সওয়া ২টো নাগাদ আমরাই প্রথম 'শিখা ইন'-এ আগুন দেখতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে ওই হোটেলের মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে একাধিকবার ফোন করি। তিনি ফোন ধরেননি। পরে তাঁর মোবাইল সুইচড অফও হয়ে যায়।' এ দিন রাত পর্যন্ত বীরেশ্বরের খোঁজ মেলেনি। কলকাতায় দু'টি এবং দিঘায় আরও দু'টি হোটেল রয়েছে বীরেশ্বরের। বেহালায় তাঁর বাড়িতে গিয়েও পুলিশ বীরেশ্বরের খোঁজ পায়নি। তাঁর স্ত্রী লিপি মিত্র যদিও দাবি করেছেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে 'হোটেলে যাচ্ছি' বলে বুধবার সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বীরেশ্বর। এর বাইরে তাঁর কিছু জানা নেই।
ঘটনার পর থেকেই দমকল এবং কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, 'এই ভবনের ভিতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় কী ভাবে এত দিন ধরে এই বেআইনি কারবার চলল এবং ট্রেড লাইসেন্স বা অনুমতি দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখতে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে।'
পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, 'মির্জা গালিব স্ট্রিটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জেরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। সিইএসসির কাছেও প্রশ্ন- কী ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বৈধ অনুমোদন যথাযথ ভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি?' যদিও পুরমন্ত্রীর অভিযোগ প্রসঙ্গে সিইএসসি-র কোনও প্রতিক্রিয়া রাত পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।