আরাফাত হুসেন
(হোটেলের আবাসিক)
রাত তখন ২টোর আশপাশে হবে। ভালো করে ঘড়িটা দেখারও সময় পাইনি। আমার কোলের বাচ্চাটা হঠাৎ কেঁদে ওঠে। ওকে দুধ খাওয়ানোর জন্য আমি ও আমার স্ত্রী ফিডিং বোতল রেডি করছিলাম। ঠিক তখনই বাইরে চিৎকার শুনতে পাই। দরজা খুলেই দেখি, সিঁড়ির দিক থেকে চারদিকে কালো ধোঁয়া। মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, আগুন লেগেছে হোটেলে।
এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। যদি আমার বাচ্চাটা না কাঁদত, তা হলে আমরা ঘুমিয়েই থাকতাম হয়তো। অথবা হয়তো ঘুমের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যেত। আল্লাহ মেহেরবান! বাচ্চাটার কান্নাই আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। আগুন লেগেছে বুঝতে পারার পরে এক মুহূর্তও দেরি করিনি। আমার স্ত্রীকে একটা হাঁক দিয়েই বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ছাদের দিকে দৌড়তে থাকি। আমার স্ত্রী প্রথমে বিষয়টা হয়তো বুঝতে সামান্য সময় নিয়েছিল। তাই ওর ঘর থেকে বেরোতে খানিকটা দেরিই হয়। সিঁড়ি দিয়ে ছুটে ওঠার সময়ে প্রত্যেকটা মিনিট এক এক ঘণ্টার মতো লাগছিল। শুধু একটাই জিনিস চাইছিলাম, যেন কারও কোনও বিপদ না হয়, সবাই যেন বেঁচে ফিরতে পারেন।
আমার ১৩ মাসের বাচ্চার চিকিৎসার জন্য মাস খানেক আগে কলকাতায় এসেছি। এই হোটেলটিতেই আছি তখন থেকে। ইএম বাইপাসের একটি হাসপাতালে ওর চিকিৎসা চলছে। আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এমন একটা রাত আমাদের জীবনে নেমে আসবে, কোনও দিন ভাবিনি।
সবচেয়ে অবাক হয়েছি, হোটেলে কোনও ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। কোনও কর্মী আমাদের রুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেনি, যে আগুন লেগেছে। কেউ উদ্ধার করতেও আসেনি। আগুন নেভানোর কোনও ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। আমার অনেকেই ছাদে আশ্রয় নিই। পরে আমার স্ত্রীও সেখানে চলে আসে। মিনিট দশ–পনেরোর মধ্যে দমকল চলে আসে। আমরা বেঁচে গেলেও পরে শুনলাম, আমাদের হোটেলেই বেশ কয়েকজন দম বন্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন। রাতের ঘটনাটার পর থেকে বাচ্চাটার কান্না এক মুহূর্তের জন্য থামছে না। ও হয়তো কিছুই বোঝে না, কিন্তু একটা ট্রমা তো ওর উপর দিয়েও গিয়েছে। আমার স্ত্রীও এখনও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
এর আগেও যখন কলকাতায় এসেছি, এই বাড়িতেই অন্য হোটেলে এসে থেকেছিলাম। কখনও এমন কোনও দুর্ঘটনা হয়নি বলেই আবার এখানেই এসে উঠি। বাড়ি ফেরার আগে আমাদের কেনাকাটা হয়ে গিয়েছিল। ২৪ অগস্ট আমার সন্তানকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা। তারপর দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এখন সব পরিকল্পনাই থমকে গিয়েছে। বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে— চিকিৎসার আশায় কলকাতায় এসেছিলাম। কিন্তু মৃত্যুর এত কাছাকাছি পৌঁছে যাব, কল্পনাও করিনি। বাড়িতে ফোন করে শুধু বলেছি, আমরা বেঁচে আছি!