মাত্র চার মাসে ১০টি পৃথক মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রবিকুমার দিবাকর। সেই বিচারকের আদালতে চলা প্রায় ১০০টি খুন-সহ গুরুতর ফৌজদারি মামলা এ বার সরিয়ে দেওয়া হলো। মামলাগুলি মুজফ্ফরনগরের জেলা জজ বীরেন্দ্র কুমার সিংয়ের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সরকারি আইনজীবী কুলদীপ কুমার সংবাদ সংস্থা PTI-কে জানিয়েছেন, যে সব মামলায় মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাবাসের বিধান রয়েছে, মূলত সেই মামলাগুলিই দিবাকরের ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত থেকে সরিয়ে জেলা বিচারকের আদালতে পাঠানো হয়েছে। জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রমোদ ত্যাগীর বক্তব্য, আইনজীবী ও মামলাকারীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, দিবাকরের আদালতে বিচার হলেই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। সেই কারণেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রবিকুমার দিবাকর গত চার মাসে যে হারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তা বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। তাঁর আদালতে এপ্রিল থেকে অগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে ১০টি মামলায় মোট ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলাগুলির মধ্যে ছিল খুন, অপহরণ এবং ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধ। একাধিক মামলায় অপরাধগুলিকে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ বা ‘rarest of rare’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
৬ এপ্রিল আইনজীবী সমীর সাইফি খুনের মামলায় তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর পরে ২৮ এপ্রিল অন্য একটি খুনের মামলায় চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০ জুন দু’জন, ২ জুলাই এক জন, ৬ জুলাই দু’জন এবং ১৭ জুলাই আরও চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক। অগস্টেও একাধিক মামলায় পাঁচ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
NALSAR University of Law-এর স্কোয়্যার সার্কল ক্লিনিকের Death Penalty in India: Annual Statistics Report 2025-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালে গোটা উত্তরপ্রদেশের ট্রায়াল কোর্টগুলি ২০টি মামলায় মোট ২৮টি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অর্থাৎ মুজফ্ফরনগরের একটি আদালতই মাত্র চার মাসে যে সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তা আগের বছরের গোটা রাজ্যের পরিসংখ্যানের কাছাকাছি।
দিবাকরের আদালতে থাকা মামলাগুলির মধ্যে আইনজীবী খুন, হোমগার্ড খুন, কৃষক খুন এবং হাইওয়েতে ডাকাতির সময়ে খুনের মতো গুরুতর অভিযোগের মামলাও ছিল। প্রায় ১০০টি মামলা নতুন করে জেলা জজের আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে কিছু প্রতিবেদনে দাবি, ৯৭টি মামলা সরানো হয়েছে।
তবে এই মামলাগুলি সরিয়ে নেওয়ার অর্থ দিবাকরের দেওয়া আগের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল হওয়া নয়। ভারতীয় আইনে দায়রা আদালত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেও তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হয় না। শাস্তি পাওয়া ব্যক্তির হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল মামলা করার সুযোগ থাকে।
রবিকুমার দিবাকরের বয়স ৪৬ বছর। ২০০৯ সালে অতিরিক্ত সিভিল জজ হিসেবে বিচার বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। উত্তরপ্রদেশের আজমগড়, সুলতানপুর, বদাউন, বারাণসী এবং বেরেলি-সহ একাধিক জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি মুজফ্ফরনগরে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে BCom এবং LLM।
রবিকুমার দিবাকরের নাম প্রথম জাতীয় স্তরে বিশেষ ভাবে আলোচনায় আসেন ২০২২ সালে। সেই সময় বারাণসীর সিভিল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ে তিনি জ্ঞানবাপী মসজিদ কমপ্লেক্সের ভিডিয়োগ্রাফিক সমীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এ ছাড়াও ২০২৪ সালে বরেলির ২০১০ সালের দাঙ্গা সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে প্লেটোর ‘ফিলজফার কিং’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন দিবাকর। পরে এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাঁর ওই মন্তব্য রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
একসঙ্গে এতগুলি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার ফলে বিচারব্যবস্থায় ‘rarest of rare’ নীতির প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের আইনে মৃত্যুদণ্ড সর্বোচ্চ শাস্তি এবং তা কেবল অত্যন্ত গুরুতর ও ব্যতিক্রমী মামলাতেই দেওয়ার কথা। ফলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একই আদালত থেকে ২২টি মৃত্যুদণ্ডের রায় সামনে আসায় বিষয়টি আইনি মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে। এর মধ্যেই প্রায় ১০০টি মামলা অন্য আদালতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মুজফ্ফরনগরের বিচারব্যবস্থা।