• বৌমাকে খুন করতে শাশুড়ির ‘সুপারি’, মুম্বইয়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্যভেদ পুলিশের
    এই সময় | ২০ আগস্ট ২০২৬
  • মাঝরাত্রে টেলিফোনের রিংটা যখন বেজে উঠেছিল, তখন রাজেন্দ্র ভাল্লাল হয়তো ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, ফোনের ও পারে কী ভয়ঙ্কর খবর তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। ফোন তুলেই গলা পান মেয়ের শাশুড়ির। ও পার থেকে জানানো হলো — তাঁর ৩৫ বছরের মেয়ে স্বপ্না ঘানজি বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন। মাথায় মারাত্মক চোট, অবস্থা সঙ্কটজনক। হাসপাতালে পৌঁছনোর পরে রাজেন্দ্র ভাল্লাল জানতে পারলেন, ততক্ষণে চিকিৎসক তাঁর কন্যা স্বপ্নাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কী ভাবে ঘটল এমন ঘটনা? শাশুড়ি ধনলক্ষ্মী ঘানজি পুলিশকে সাফ জানান, পুত্রবধূ মদ্যপ অবস্থায় ঝামেলা করছিলেন এবং অসাবধানতাবশত বাথরুমে পড়ে গিয়েই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সত্যিই কি তাই? মেয়ের শাশুড়ির এই দাবির আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের গল্প — যা গল্প হলেও সত্যি।

    মুম্বইয়ের ঘাটকোপারে, রবিবার রাতে (১৬ অগস্ট) ঘরের বাথরুমে পড়ে গিয়ে ৩৫ বছরের স্বপ্না ঘানজির মৃত্যুকে প্রথমে সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও পরে ঘুরে যায় গোটা ঘটনার মোড়। মৃতার বাবা অভিযোগ করেন, মেয়ের শরীরে রয়েছে একাধিক সন্দেহজনক ক্ষত। তাঁর অভিযোগ ছিল, শুধু মাথায় আঘাতের চিহ্ন নয়, স্বপ্নার মুখ, ঘাড় ও কাঁধে স্পষ্ট কালশিটের দাগ ছিল। পাশাপাশি, ঘাটকোপার এলাকার ওই বাড়ি যে পন্থনগর থানার অন্তর্গত, সেখারকার পুলিশেরও নজর কাড়ে স্বপ্নার গলার চারপাশে নীলচে দাগ এবং মাথার এক পাশে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের চিহ্ন। বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেলে কি এ ভাবে গলার চারপাশে চেপে ধরার দাগ আসতে পারে? এর পরেই আপাতদৃষ্টিতে যা পুলিশের খাতায় রুজু হয়েছিল অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা হিসাবে, তা বদলে গেল খুনের মামলায়। নতুন করে তদন্ত শুরু করল পুলিশ। প্রথমেই গ্রেপ্তার করা হলো স্বপ্নার ৬৫ বছরের শাশুড়ি ধনলক্ষ্মী ঘানজিকে। তখনও স্বপ্নার স্বামী অর্থাৎ ধনলক্ষ্মীর ছেলে — যিনি তখন দুবাইয়ে কর্মরত — জানেনও না মুম্বইয়ের বাড়িতে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গিয়েছে।

    দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারী দল যখন শাশুড়ি ধনলক্ষ্মীকে জেরা করা শুরু করে, তখনই বেরিয়ে আসতে শুরু করে একের পর এক অসঙ্গতি। প্রথমে তিনি বৌমার বাথরুমে পড়ে যাওয়ার গল্প আওড়ান। পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে ধনলক্ষ্মী দাবি করেন, বাথরুমে নয় — বচসার সময়ে ধাক্কা লেগে স্বপ্না নীচে পড়ে যান। যদিও ফরেনসিক ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, মৃতার মাথার ক্ষতটি তৈরি হয়েছে কোনও ভোঁতা ও শক্ত বস্তু দিয়ে সজোরে আঘাতের জেরে।

    রহস্যের আসল মোড় ঘোরে ফ্ল্যাটের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ ও কল ডিটেলস রেকর্ড হাতে আসার পরে। সেখান থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে সমঝোতার বাহানায় ধনলক্ষ্মী স্বপ্নার বাড়িতে যান। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে অলক্ষ্যে সেই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করছে আরও চারজন—যাঁরা আসলে ধনলক্ষ্মীর প্রাক্তন পরিচারিকা মঙ্গলা যাদব, তাঁর স্বামী সুরেশ, মেয়ে শিবানী এবং ছেলে সাজন।

    তদন্তকারীদের দাবি, জেরায় ধনলক্ষ্মী জানিয়েছেন, স্বপ্নাকে খুন করার জন্য তিনি ওই পরিবারকে মোট ৩ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। টানা পুলিশি জেরার মুখে অবশেষে ভেঙে পড়েন চার অভিযুক্ত। তাদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, অতীতের নানা মনোমালিন্যের জেরে জমে থাকা আক্রোশ থেকেই নিজের বৌমাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষেছিলেন শাশুড়ি। পরিচারিকা মঙ্গলাকে দেন ৩ লাখ টাকার ‘সুপারি’।

    পুলিশের অভিযোগ, অভিযুক্তরা বাড়িতে ঢুকে প্রথমে স্বপ্নার চোখে লঙ্কার গুঁড়ো ছুড়ে দেন। এর পরে মাথায় কাচের গ্লাস ও ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে অজ্ঞান করে দেওয়া হয়। এতেও মৃত্যু না হওয়ায় ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরা হয় এবং শেষে তরুণীর গলায় পা দিয়ে পিষে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এর পরে রক্ত ধুয়েমুছে বিষয়টিকে সাধারণ বাথরুমে পড়ে মৃত্যুর দুর্ঘটনা রূপে তুলে ধরা হয়েছিল। ​কিন্তু সুচতুর ষড়যন্ত্রী হলেও পুলিশের নিখুঁত চোখ ও ডিজিটাল এভিডেন্সের ফাঁদে ধরা পড়ে যান বৌমার খুনে অভিযুক্ত ধনলক্ষ্মী-সহ পাঁচ অভিযুক্তই। পন্থনগর থানার হাতে সকলেই এখন ধৃত।

    পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক পারিবারিক বিবাদের কথা। শাশুড়ির সঙ্গে স্বপ্নার কোনও দিনই সুসম্পর্ক ছিল না। ২০২৪ সালে নালাসোপারা থানায় শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ তুলে FIR করেছিলেন স্বপ্না। সেই ঘটনার পর থেকেই ধনলক্ষ্মীর সঙ্গে তাঁর তিক্ততা বাড়তে থাকে বলে ধৃতদের জেরা করে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

    এ ছাড়া স্বপ্নার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত মদ্যপান করেন — এমন সন্দেহও ছিল তাঁর শাশুড়ির। চলতি বছরের জুন মাসে দুবাই থেকে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্না মুম্বইয়ে ফিরে আসেন। তাঁর স্বামী অবশ্য কাজের কারণে দুবাইতেই ছিলেন। এর পরে পারিবারিক অশান্তি তুঙ্গে ওঠায় তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে। আর তার জেরেই ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

  • Link to this news (এই সময়)