শুভাশিস সৈয়দ
শুধু ইকবাল হোসেন নন। তাঁর জেঠতুতো দিদি-বোনেরাও একই ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলে ভেসে থাকেন। তাঁদেরও গায়ে জ্বালা করে! সেই অস্বস্তি থেকে রেহাই পেতে যখন তখন জলে নেমে পড়েন তাঁরাও। কিন্তু ইকবালের মতো তাঁদের তো আর মুম্বইয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো না। এই পরিস্থিতিতে তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত মা গুলশন বেওয়া। চিকিৎসার খরচ কোথা থেকে আসবে, আপাতত চিন্তা তা নিয়েই।
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বড়ুয়ার ফরাজিপাড়া গ্রামে ইকবালদের বাড়ির পাশে গুলশনদের বাড়ি। চার বছর আগে গত হয়েছেন তাঁর স্বামী মুরসালিম। এখন তিন মেয়ে— তৌফিকা পারভিন, নাসরিন সুলতানা এবং তানিয়া সুলতানাকে নিয়ে ওই বাড়িতে থাকেন বছর বিয়াল্লিশের গুলশন। তিনি জানান, ইকবালের মতো তাঁর তিন মেয়ের গা-ও জ্বালা করে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই গ্রামের পুকুরে নেমে পড়েন তাঁরা। গুলশনের কথায়, ‘বহু দিন এ রকম হয়েছে, অন্ধকার না নামা পর্যন্ত ওরা জল থেকে ওঠে না। আর অন্য সময়ে তো সারা দিনে কত বার যে স্নান করে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। তার উপরে ফ্রিজের ঠান্ডা জল খাবে শুধু। এ সব কারণে ওরা শ্বাসকষ্টের রোগী। বিভিন্ন বেলডাঙা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ইঞ্জেকশন আর অক্সিজেন দেওয়ার পরে যন্ত্রণা কমে।’
তিন মেয়েকেই স্কুলে ভর্তি করেছিলেন গুলশন। কিন্তু কেউ বেশি দূর পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। বড় মেয়ে, বছর বাইশের তৌফিকা মাধ্যমিক পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু পাশ করতে পারেননি। তার পরেই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন। মেজ মেয়ে, ১৮ বছর বয়সি নাসরিনা পড়েছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। আর ক্লাস টুয়ের পরেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ছোট মেয়ে তানিয়া (১৬)-র। গুলশন বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে এবং এক ছেলে। ছোটবেলায় ভালোই ছিল তিন মেয়ে। কিন্তু বয়স ১০-১২ বছর হতেই ওদের মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ করি। ধীরে ধীরে মোটা হতে থাকে ওরা। এখন তিন জনের ওজন ১০০ কিলো পেরিয়ে গিয়েছে!’
পরিস্থিতি এমনই যে, সেই অর্থে বাড়ির কোনও কাজই করতে পারেন না তৌফিকারা। এমনকী রান্না করতেও পারেন না। তৌফিকা বলেন, ‘সারা শরীর জ্বালা করে। কমে শুধু জলে থাকলে বা স্নান করলে। ফলে এই অসুস্থতা নিয়ে চলাফেরা করতে অসুবিধে হয়। মা দুপুরে কাজ থেকে ফিরে রান্না করলে তবে খেতে পাই।’ তৌফিকাদের কাকিমা নাসিমা খাতুন বলেন, ‘ইকবালের মতো এই তিন মেয়েরও চিকিৎসা করানো একান্ত প্রয়োজন। ওরা রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চায় পুকুরে ডুবে থাকার জন্য। সেই জন্য ওদের মা বারান্দায় একটা গ্রিল লাগিয়েছে। সেটা তালাবন্ধ করে রাখা হয়, যাতে মেয়েরা যখন তখন বাইরে বেরোতে না পারে।’
গুলশনও জানেন, অবিলম্বে মেয়েদের চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি মাদ্রাসায় পরিচারিকার কাজ করি। মাসে তিন হাজার টাকা পাই। ওই টাকায় এবং আত্মীয়পরিজন ও এলাকার মানুষের সাহায্যে কোনও রকমে সংসার চলে। তিন মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাব কী করে!’
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন ইকবালের মতো তৌফিকাদেরও মুম্বই নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হলো না? তবে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, জলে ভেসে থাকার ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ায় ইকবাল যে ভাবে প্রচারের আলোয় চলে এসেছিল, তাতে তৌফিকাদের কথা এত চাপা পড়ে গিয়েছিল কয়েক দিনের মধ্যে। স্থানীয়দের আশা, এ বার তৌফিকাদের নিয়ে কথা হলে, সম্ভবত তাঁদের চিকিৎসার জন্য কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে।
গুলশনদের পরিবার সূত্রে খবর, ইকবাল-তৌফিকাদের মতো তাঁদের দাদু মুস্তাফা শেখের ওজনও একটা সময়ের পরে অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। মুস্তাফার দুই ছেলে মুরসালিম এবং হাসিবুলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। তিন জনেই মধুমেহর রোগী ছিলেন। আর তিন জনেরই অকালমৃত্যু হয়। এটা কি জিনগত বিষয়? মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিক ভাবে এটাকে বংশগত অসুখ বলে মনে হচ্ছে। তবে পরীক্ষা না করে তো কিছু বলা মুশকিল। আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে আমরা যাবতীয় চিকিৎসা করে দেখতে পারি।’
অন্য দিকে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্যের মতে, দেহের ওজন বেড়ে যাওয়ায় ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়ে গভীর মানসিক অবসাদ জন্ম নিয়ে থাকতে পারে। মানসিক কষ্ট তখন শারীরিক জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়, তাকে ‘সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার’ বলা হয়। তাই গলা-অবধি জলে ডুবে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। বিশেষজ্ঞ আরও বলেন,‘স্থূলতার সঙ্গে হরমোনের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে অর্থাভাবের কারণে ও গুরুত্ব না দেওয়ায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা হয়নি। আর জলে দিনের পর দিন ডুবে থাকার ফলে এক্সফোলিয়েটিভ ডার্মাটাইটিস, স্কেবিস, টিনিয়া প্রভৃতি চর্মরোগের সঙ্গে মানসিক সমস্যা জন্ম নেওয়াও স্বাভাবিক। অবিলম্বে ওই রোগীর চিকিৎসা হলে সমস্যার সমাধান হবে।’