• বজ্র আঁটুনিতে কী লাভ হলো, যাদবপুরের ক্যাম্পাসে তাণ্ডবে উঠছে প্রশ্ন
    এই সময় | ২১ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: ৬৩ লক্ষ টাকা খরচ করে বসানো হয়েছে ৭০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩০ জন প্রাক্তন সেনা আধিকারিককে নিয়োগ করে মাসে ৯ লক্ষ টাকা বেতনও গুনছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো কি?

    বুধবার রাতভর যাদবপুর ক্যাম্পাসে যে ভাবে অবাধে বহিরাগতদের তাণ্ডব চলেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার ঢিলেঢালা ছবিটাই ফের বেআব্রু করে দিল বলে মনে করছেন পড়ুয়া এবং শিক্ষকদের অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে, যে ক্যাম্পাসে র‍্যাগিং ও যৌন হেনস্থার জেরে প্রথম বর্ষের পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে, ফেস্ট চলাকালীন এক ছাত্রী জলে ডুবে মারা গিয়েছেন, সেই ক্যাম্পাসে এত নিরাপত্তার বহরের পরেও চলল বহিরাগতদের তাণ্ডব। তা হলে কাজের কাজ কী হলো?

    প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও। বুধ ও বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে এত কাণ্ড ঘটে যাওয়ার পরেও উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনার নিন্দা করা ছাড়া আর কোনও কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দেননি। পড়ুয়া–শিক্ষকদের বড় অংশের দাবি, তাঁরাও বুধবার রাতের তাণ্ডব চলাকালীন উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অনুষ্ণা দাসের কথায়, ‘ভিসির সঙ্গে আমরা বুধবার রাতে কোনও যোগাযোগই করতে পারিনি। এই ভাবে তাণ্ডব চলছে জেনেও কর্তৃপক্ষ কোনও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি।’

    পুলিশ সূত্রে দাবি, বুধবার রাতে ক্যাম্পাসের ভিতরে গোলমালের খবর পেয়ে যাদবপুর থানার অফিসাররা উপাচার্য এবং অন্য আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। পরে ১০০ ডায়ালে ক্যাম্পাসের ভিতরে গোলমাল সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্যও যাদবপুর থানার আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্যাম্পাসের ভিতরে পুলিশি সহায়তার অনুরোধ করেন। তারপরে পুলিশ পদক্ষেপ করে। যদিও উপাচার্য এ দিন বলেন, ‘আমার সঙ্গে পুলিশের কথা হলে আমি বলি, আপনারা ক্যাম্পাসের বাইরে অপেক্ষা করুন। রেডি থাকুন। কিন্তু যতক্ষণ না প্রয়োজন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ঢুকবেন না।’

    বৃহস্পতিবার এবিভিপির যাদবপুর অভিযান এবং বাম ছাত্রদের জমায়েত ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের চার নম্বর গেট। বহু শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীকে সেখানে দেখা গেলেও ভিসি, প্রো–ভিসি বা ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে সেখানে দেখা যায়নি। ভিসির ঘরের বাইরের গেট ছিল তালাবন্ধ। যদিও তিনি ক্যাম্পাসে এসেছিলেন এবং সূত্রের দাবি, এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে তিনি প্রাক্তনীদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। কিন্তু তিনি কখন ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান, তা কেউই বলতে পারেননি।

    বুধবারের ঘটনায় ক্যাম্পাসে তাণ্ডব যাঁরা চালিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার দাবিতে প্রো–ভিসি অমিতাভ দত্তকে এ দিন ঘেরাও করেন পড়ুয়ারা। শিক্ষকদের প্রশ্ন, ঘেরাও করতে হচ্ছে কেন? কেন আগেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে অভিযোগ দায়ের করলেন না? এত কিছুর পরে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে চিরঞ্জীব অবশ্য আশ্বাস দেন, আজ, শুক্রবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পুলিশের কাছেও অভিযোগ দায়ের করা হবে। ঘটনার রাতের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রেখে তা তদন্ত কমিটি এবং পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে, যাতে হামলাকারীদের চিহ্নিত করা যায়। শিক্ষক সংগঠন আবুটার তরফে গৌতম মাইতির প্রশ্ন, ‘এত বড় ঘটনা ঘটার সময়ে ভিসি, প্রো–ভিসি, রেজিস্ট্রার হাত গুটিয়ে বসেছিলেন কেন? কেন বুধবার রাতেই তাঁরা ক্যাম্পাসে এসে পরিস্থিতি সামলাতে পারলেন না?’

    শিক্ষক সংগঠন জুটার সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়রা এই তাণ্ডব এবং কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে আজ কর্মবিরতি পালনের ডাক দিয়েছেন। পার্থপ্রতিমের কথায়, ‘ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ আছে। ছাত্রছাত্রীরা, বিশেষ করে ছাত্রীরা ভয়ের মধ্যে রয়েছেন। কর্তৃপক্ষের যে সক্রিয়তা দরকার ছিল, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’ আবার গেরুয়াপন্থী শিক্ষক সংগঠন এবিআরএসএমের পক্ষে ভাস্কর সর্দারের দাবি, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশে পার্মানেন্ট পুলিশ আউট পোস্টের ব্যবস্থা করা হোক।’ যদিও উপাচার্যের বক্তব্য, ‘আমরা ক্যাম্পাসে পুলিশ আউট পোস্ট হোক সেটা চাই না।’

  • Link to this news (এই সময়)