এক সময়ে দেওয়ালে ফাটল ছিল। ছাদ চুঁইয়ে জলও পড়ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় তা মেরামত হয়েছে ঠিকই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত মেদিনীপুর বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির (বিদ্যাসাগর হল)-এর ভিতরটাও ঝাঁ চকচকে। কিন্তু যে প্রত্নতত্ত্বশালায় অন্তত ২০১টি বাংলা ও প্রায় ৪০০টির মতো সংস্কৃত পুঁথি রয়েছে, যেখানে মহারাজা শশাঙ্কের সময়কালের দু’খণ্ড তাম্রশাসন এবং প্রচুর প্রাচীন বই সুরক্ষিত থাকার কথা, সেই জায়গা কেন সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে এত দূরে? ইতিহাসবিদদের একাংশের আশঙ্কা, এ ভাবে যদি চলতে থাকে, তা হলে শতবর্ষ প্রাচীন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এই শাখা ধীরে ধীরে অন্ধকারের গর্ভে তলিয়ে যাবে।
অনেকেরই অভিযোগ, এ ব্যাপারে কখনওই উদ্যোগী হননি কর্তৃপক্ষ। শুধু তা-ই নয়, আগের মতো বার্ষিক সভাও এখন হয় না। সে কথা অবশ্য কর্তৃপক্ষই স্বীকার করেছেন। অথচ, এক সময়ে মেদিনীপুর শাখার এই সাহিত্য পরিষদে সভাপতিত্ব করেছেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সরলাদেবী চৌধুরানি থেকে ভাষাতত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, প্রমথনাথ বিশী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কবিশেখর কালিদাস রায়, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)-রাও।
মেদিনীপুর শহরের ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির’-এর সামনের অংশেই এককালে বসত সাহিত্যের আসর। তখনও দেশভাগ হয়নি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা খোলা হচ্ছে ঢাকা, লাহোর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তখনই মেদিনীপুর শহরে গড়ে ওঠে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা। যদিও তার আগেই ১৯১১ সালে ‘মেদিনীপুর সাহিত্য সমাজ’ তৈরি হয়েছিল সাহিত্যচর্চার জন্য। ১৯১৫ সালে মেদিনীপুর সাহিত্য সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনে সেটিও মিশে যায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা রূপে। ১৯১৫ সালের ৬ জুন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের দশম মাসিক অধিবেশনে মীরাট শাখা, মেদিনীপুর শাখা এবং মানভূম শাখা স্বীকৃতি পায়। সেই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং সহকারী সম্পাদক ছিলেন ব্যোমকেশ মুস্তফি। তখনও অবশ্য সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার কোনও ঘর ছিল না। ১৯৩৮ তৎকালীন মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিনয়রঞ্জন সেনের সভাপতিত্বে ‘পরিষদ ভবন নির্মাণ সমিতি’ নির্মিত হয়। ওই বছরই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তার পরে ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর কবিগুরু সেই বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করেন।
মেদিনীপুরবাসীর কাছে এই ভবন ‘বিদ্যাসাগর হল’ নামেই অধিক পরিচিত। বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার ইতিহাস ধরে রাখতে বছরের পর বছর ধরে বহু নথি সংগ্রহ করে বই আকারে তা প্রকাশও করেছেন ‘অমিত্রাক্ষর’ পত্রিকার সম্পাদক অচিন্ত্য মারিক। তাতে মেদিনীপুর শহরের সাহিত্যচর্চা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার কার্যকলাপ, পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও রয়েছে। অচিন্ত্যর আক্ষেপ, ‘২০১৭ সাল থেকে আর সাহিত্য পরিষদের কোনও কার্যকলাপ নজরে পড়েনি। অথচ, এটির গুরুত্ব বিশ্বজোড়া বলেই আমি মনে করি। আমি চাই, এটি মানুষের সামনে তুলে ধরা হোক।’
সাহিত্যিক ঋত্বিক ত্রিপাঠীর মতে, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশ করা হোক। যাতে ঘরে বসেও দেশ-বিদেশের মানুষ তা দেখতে পারেন, গবেষণার জন্য সাহায্য নিতে পারেন।’ মেদিনীপুরের বিধায়ক শঙ্কর গুছাইত বলেন, ‘আমি জেলাশাসককে নিয়ে বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির পরিদর্শন করেছি। কী ভাবে উন্নতি করা যায়, মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়, তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ করব।’
যদিও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার ট্রাস্টি বডির সম্পাদক শচীন্দ্রনাথ মিশ্রের বক্তব্য, ‘একেবারে খোলা হয়নি, এমন নয়। আমরাও এই প্রতিষ্ঠানকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে ওয়েবসাইট বানানোর পরিকল্পনা করেছি। যাতে সমস্ত নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ডিজিটাল পদ্ধতিতে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়। আবার স্কুল পড়ুয়া বা গবেষকদের দেখার ইচ্ছে হলে, ওয়েবসাইটে সেই ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারবেন। তাঁদের দেখার জন্যও ব্যবস্থা করা হবে।’
বিদ্যাসাগর হলে এককালে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত, মহাত্মা গান্ধী, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জেবি কৃপালনী, কৈলাশনাথ কাটজু, বিধানচন্দ্র রায়, ক্ষিতিমোহন সেন, হুমায়ুন কবীর, হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়, শিশিরকুমার ভাদুড়ি, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, অনুরূপা দেবী, শান্তিলতা দেবী, মহারানি রাধারানি মহাতব, পঞ্চানন চক্রবর্তী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপনারায়ণ সিং, এএল ডায়াস, রাসবিহারী রায়ের মতো ব্যক্তিদের।
অচিন্ত্য জানালেন, বিদ্যাসাগর হলে প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রি রয়েছে। ১৯৭৬ সালের ৭ ডিসেম্বর সে সব নিবন্ধিত হয়েছে। তার মধ্যে যা রয়েছে — মাটির তৈরি শ্রীশ্রীলক্ষ্মীর ঘট, পোড়ামাটির মনসামূর্তি, গদাধর মূর্তি, ষড়ভূজ মূর্তি, কালোপাথরের বুদ্ধমূর্তি, হরগৌরী, পোড়ামাটির কৃষ্ণ-বলরাম, নৌকা-বিলাস, পাদ-পীঠ নকশা, কালোপাথরের মদনমোহন, ফারসি প্রস্তর ফলক, মুণ্ডহীন বিষ্ণুমূর্তি, বিষ্ণুর মুখমণ্ডল, বিষ্ণুপট, শ্বেতপাথরের ঋষভনাথ, কালোপাথরের ঋষভনাথ, নাড়ুগোপাল, ছোট-বড় তাম্রশাসন, নালন্দা শীল, বিষ্ণুমূর্তি, পারসি সনদ, পাথরের শিলালিপি, টেরাকোটা ফলক, জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তি এবং একটি অজ্ঞাত দেবমূর্তি।
এ ছাড়া হাতে পুঁথির মধ্যে রয়েছে — কাশীরাম দাসের মহাভারত (আদিপর্ব), সত্যনারায়ণ পাঁচালী, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের অন্নদামঙ্গল, কবিচন্দ্রের কলঙ্ক ভঞ্জন, জ্ঞানানন্দ দাসের উপাসনাচন্দ্রিকা, নরোত্তম দাসের আশ্রয় নির্ণয়।
অচিন্ত্য জানান, বড় তাম্রশাসনটির আকার ২৫×১৩ সেমি এবং ১৯X১১ সেমি। আর একটি ছোট তাম্রশাসন রয়েছে। দু’টিরই গঠন এক। কোদাল আকৃতির। কোদালের যেখানে দণ্ড থাকে, সেখানে একটি মোহর রয়েছে। সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে যেমন গুপ্তাক্ষর প্রচলিত ছিল, এই তাম্রশাসনের লিপি তদনুরূপ। তাম্রশাসনের একদিকে লিপি উৎকীর্ণ আছে। অন্য দিকে কিছু নেই। বড় ফলকটি সম্পূর্ণ নয়। সেটির কোণ ভগ্ন। বাংলা ১৩৫০ সালে প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাম্রফলক দু’টি পাঠোদ্ধারের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। অচিন্ত্য বলেন, ‘১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হিস্ট্রি অফ এনশিয়েন্ট বেঙ্গল গ্রন্থে তাম্রফলকের কাল নির্ণয় করে লিখেছিলেন যে, সেগুলি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধের। মহারাজ শশাঙ্ক ৬১৯-৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মারা যান। এই তাম্রলিপি থেকে পরিষ্কার, শশাঙ্কের রাজত্ব সুবর্ণরেখা পেরিয়ে দাঁতন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’