• ফেলো কড়ি, নাও লাইসেন্স, নিউ মার্কেটে ওড়ে হাওয়ালার টাকা! ‘শিখা’র আগুনে আলোয় ‘অন্ধকার জগৎ’
    প্রতিদিন | ২২ আগস্ট ২০২৬
  • ‘ধর্মতলা, ধর্মতলা…’ হাঁক দিয়ে যাত্রী নামিয়েই কন্ডাকটরটা ঝুলে পড়ল বাসে। পিছনে তখন তারস্বরে হর্ন বাজাচ্ছে হলুদ ট্যাক্সি। মাথায় গামছা খুলে ঠেলা গাড়িতে শুয়ে থাকা মুটেটা বেশ বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। উলটো দিকের ফুটপাথের উপর সারি দেওয়া দোকানিরা ব্যস্ত খদ্দের টানতে। ভরদুপুরে জমজমাট নিউ মার্কেট চত্বর। সেই রাস্তা ধরে মিনিট খানেক এগিয়ে গেলেই শ্মশানের নিস্তব্ধতা! বুধবার রাতে ৯ জলজ্যান্ত প্রাণের শেষ পরিণতি দেখা মির্জা গালিব স্ট্রিট খাঁ খাঁ করছে। আর এই নিস্তব্ধতার আড়ালেই লুকিয়ে এক অন্ধকার জগৎ! যার খানিকটা আলোকিত হয়েছে ‘শিখা’র আগুনে।

    ঘিঞ্জি গলির মধ্যে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রাশি রাশি হোটেল। কোনওটার ভাড়া ৫০০, কোনওটা আবার তারও কম! বলা যেতে পারে, জলের দরে ফলের রস বিকোয় নিউ মার্কেট চত্বরের এই এলাকায়। শুধু সস্তায় হোটেলই নয়, নিউ মার্কেট ঘিরে দু’কিমি ব্যাসার্ধের এলাকায় চলে বড়সড় দুর্নীতির চক্র! জানা যাচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই চক্রে একদিকে যেমন পুরসভা-পুলিশ-দমকলের অফিসারদের একাংশ জড়িত, অন্যদিকে বহু নামী ব্যবসায়ী-রাজনৈতিক নেতারাও যুক্ত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। বস্তুত সেই কারণেই নিউ মার্কেটের চারপাশ ঘিরে শুধু হোটেল বা শপিং-কমপ্লেক্স নয়, অধিকাংশ বহুতলের নির্মাণ থেকে শুরু করে ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স অনুমোদন ও সিইএসসির সংযোগেও বহুদিন ধরে অজস্র বেনিয়ম চলে আসছে। 

    স্টিফেন কোর্ট বা বড়বাজারের অগ্নিকাণ্ডের পর যে শহরের বহুতলগুলির ফায়ার-সিস্টেমের কোনও সংশোধন হয়নি তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল শিখা-ইন-এর ঘটনা। দমকলের সদর দফতরের দুটি বাড়ি পরের এই ভয়ংকর ঘটনায় পুরসভা ও ফায়ার অডিটে বড়মাপের দুর্নীতির পাশাপাশি পুলিশ এবং সিইএসসির ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের গাফিলতির দিকে আঙুল উঠেছে। অভিযোগ, এমন বেআইনি জতুগৃহসম হোটেলে প্রতিবছর যে ফায়ার লাইসেন্স ‘রিনিউ’ করার ক্ষেত্রে লক্ষাধিক টাকা ‘টেবিলের নিচে’ লেনদেন হত। ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে দমকলের সদর দপ্তরের বাইরে নির্দিষ্ট দোকানের সামনে দালালরা বসে এই ‘ডিল’ করতেন বলে অভিযোগ। অভিযোগ, পুরসভার বিল্ডিং ও লাইসেন্স বিভাগের একাংশ এই চক্রে জড়িত। আর তাই শিখা-ইন-এর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে তদন্তের নির্দেশের পাশাপাশি বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল। পুরসভার গাফিলতি নিয়ে তদন্তে নেমে সমস্ত বরোর অধীনে থাকা বহুতলের ফায়ার অডিটের নির্দেশ দিয়েছেন। পুর প্রশাসন সূত্রে খবর, আগামী ২৫ আগস্ট থেকে শহরের ১৬টি বরোর অধীনে থাকা সমস্ত বাণিজ্যিক বহুতল, মার্কেট, হোটেল ও জনসমাগম স্থলগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ও যাবতীয় সুরক্ষা খতিয়ে দেখবে বিশেষজ্ঞ টিম।

    প্রসঙ্গত, বুধবার রাতে হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মৃত ৯ জনের মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশি। জানা গিয়েছে, নিউ মার্কেটের ওই অঞ্চলে বাংলাদেশিদের যাতায়াত কলকাতার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ খানিকটা বেশি। এর নেপথ্যে কী কারণ? কানাঘুষো অনেক কথাই ঘুরছে মির্জা গালিফের অলিগলিতে। সূত্রের খবর, ওই এলাকায় ছোট ছোট কাউন্টারে বেআইনিভাবে বাংলাদেশি কারেন্সি এক্সচেঞ্জ হয় ঘুরপথে। সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে দিনের পর দিন এই এলাকা থেকে বাংলাদেশি টাকা হাত বদল হয়েছে। আর সেই টাকা ঘুরপথে নাকি হাওয়ালায় পৌঁছে যেত। হোটেল ‘শিখা ইন’-এ আগুনে আলোয় এসে পড়েছে নিউ মার্কেটের ‘অন্ধকার জগৎ’ !
  • Link to this news (প্রতিদিন)